পূর্ব পাকিস্তানে তখন আওয়ামী লীগের মধ্যেই চরম কোন্দল। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। অবশেষে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। তাঁকে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয় এবং বিদেশে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে সফর করতে দিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে রওনা হন। কিন্তু ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। শেখ সাহেবকেও ফিরে আসতে হয়।
এসময় আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারে তুমুল কোন্দল দেখা দেয়। এই সুযোগ গ্রহণ করে কৃষক শ্রমিক পার্টি। বিভক্ত কৃষক শ্রমিক পার্টি আবু হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান বুঝতে পারেন, যে কোনো সময় তাঁর মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে। তিনি গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি করার আহ্বান জানান। তাঁর কথা না শুনে ৩০ মার্চ গভর্নর তাঁকে পদচ্যুত করেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন আবু হোসেন সরকার। আবু হোসেন সরকারের অনুরোধে ঐদিনই পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি হয়। কেন্দ্রে তখন প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন। তাঁর সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে ফিরোজ খান নুন গভর্নর ফজলুল হককে ৩১ মার্চ অপসারণ করেন। ১ এপ্রিল আতাউর রহমান আবারও মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। পরিষদে ন্যাপের সদস্য সংখ্যা ৩৩। ন্যাপ ভোটাভুটিতে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবার ফলে আতাউর রহমান সরকারের পতন ঘটে ১৯ জুন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন আবু হোসেন সরকার। ২২ জুন আবু হোসেন সরকার অনাস্থা ভোটে পরাজিত হন। ২৫ জুন পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট শাসন প্রবর্তিত হয়। এই রাজনৈতিক উত্থান-পতনের জন্যে মূলত দায়ী ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। তারা কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনো কৃষক শ্রমিক পার্টিতে ভোট দিয়ে এক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাবার জন্যেই শেষ পর্যন্ত একটির পর একটি মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।
পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রেসিডেন্ট শাসনও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। শহীদ সোহরাওয়াদী পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকেন। তাঁর প্রধান দাবি ছিল ১৯৫৯ সালে সাধারণ নির্বাচন দিতে হবে। এই শর্তে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ফিরোজ খান নুনকে সমর্থন দিতে রাজি হন এবং এই ভিত্তিতেই ফিরোজ খান নুন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রেসিডেন্ট শাসন প্রত্যাহার করেন। ২২ জুলাই পুনরায় আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রাদেশিক অধিবেশন বসে। তখন পরিষদের স্পিকার ছিলেন জনাব আবুল হাশিম। আবুল হাশিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। সরকার পক্ষ থেকে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
নতুন স্পিকার নির্বাচিত হন ডেপুটি স্পিকার জনাব শাহেদ আলী। শাহেদ আলীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরিষদে তুমুল হাঙ্গামা হয়। হাঙ্গামায় আহত হয়ে শাহেদ আলী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই পরিবেশে কেন্দ্রীয় সরকার আর একটি চাল দিলেন। এবার বলা হলো। আওয়ামী লীগকে কেন্দ্রীয় সরকারে অংশ নিতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো আওয়ামী লীগের দু-একজন সদস্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগদান করবে। অনেকেই সম্মত হলো না। বলা হলো ১৯৫৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সারা পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন হবে। শেষ পর্যন্ত ২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কতিপয় সদস্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। দফতর বণ্টনের ব্যাপারে অসভ্রষ্ট হওয়ায় ৭ অক্টোবর তাঁরা পদত্যাগ করেন। ওই দিনই ইস্কান্দার মীর্জা তাঁর বাসভবনে একটি পার্টির ব্যবস্থা করেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরাসহ সকলেই এই পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন। পার্টি শেষে সকলেই যে যার বাসায় ফিরে যান। আর ওই রাত্রিতেই প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করেন। সংবিধান রহিত করেন। প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক শাসক নিয়োগ করেন। আমি তখন ঢাকা হলে। ঢাকা হলেও তখন এক অস্থির পরিস্থিতি।
ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমার রাজনৈতিক জীবন ও ঢাকা হলের জীবনে। আমি, এনায়েতুল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, আব্দুল হালিম, কাজী বারী প্রমুখ ছাত্রলীগ ছেড়ে দিলাম। আমি ব্যতীত অন্যান্য সকলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। তাদেরকে কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্রলীগে কাজ করতে বলেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা ছিল তারা ছাত্রলীগে ঢুকে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করবে। এটা নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনেও ঘটেছিল। এককালে ছাত্র ফেডারেশনেও ঘটেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ও জয়প্রকাশ নারায়ণের কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির দ্বন্দ্ব ছিল। আর অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য যে কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিএসপির ছাত্রফ্রন্টের নেতা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির অমিয় দাশগুপ্ত। তবে কমিউনিস্ট পার্টির এই অন্যের দল দখলের নীতি তেমন কাজে আসেনি। কমিউনিস্ট পার্টিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হারিয়ে।
