তবে ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাইয়ের একটি ভিন্ন কাহিনীও আছে। সেদিন ন্যাপের সম্মেলন এবং জনসভায় আওয়ামী লীগের গুণ্ডামি ছিল অবিস্মরণীয়। সেদিন পল্টন ময়দানে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মানিত নেতাদের ওপর গুণ্ডারা হামলা করেছিল। পণ্ড করতে চেয়েছিল রূপমহল হলে তাদের সম্মেলন। আওয়ামী লীগের সে আচরণ ছিল অশোভন, বর্বর এবং ধৃষ্টতাপূর্ণ আর দৈনিক ইত্তেফাক সেদিন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে Nehru Aided Party বলে অভিহিত করেছিল।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের আগে মওলানা ভাসানী আমাকে ডেকেছিলেন। বললেন, আমি নতুন দল গঠন করছি। আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিচ্ছি। তোমরা ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়েছ–আমার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান যাবে। দেখা যাক সারা পাকিস্তানব্যাপী কোনো সংগঠন গড়ে তোলা যায় কি না।
মওলানা সাহেবের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ব্যারিস্টার শওকত আলীদের সদরঘাটের বাসায়। মওলানা সাহেব খুব আন্তরিক হলেও বোঝাতে পারলাম না যে এটা হবার নয়। কমিউনিস্ট পার্টি কিছুতেই আমাকে এ ধরনের কোনো সুবিধা দেবে না। কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য অনুযায়ী আমি ট্রটস্কিপন্থী। তারাই একমাত্র সাচ্চা কমিউনিস্ট। অন্যান্য সকলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। আর দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে শতকরা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ জন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই ট্রটস্কির কোনো মূল গ্রন্থ পড়েনি। দলীয় প্রচার পুস্তিকা পড়ে এবং নেতাদের কাছে শুনে ট্রটস্কির মুণ্ডপাত করছে। আমি আদৌ ট্রটস্কিপন্থী নই। আমাদের দল সেকালের আরএসপি (বর্তমানে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল) লেনিনপন্থা অনুসারী ট্রটস্কি বা স্টালিনকে সঠিক বলে মনে করে না। তবে রুশ বিপ্লবের নেতা হিসেবে সকলকেই সম্মান দেয়।
এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল, ভিন্ন। কোনো দলে অনুপ্রবেশের নীতি নিয়ে। ব্রিটিশ ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি মনে করতো অন্য দলে নিজেদের সদস্যদের ঢুকিয়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করা যায় বা সীমিত ক্ষেত্রে হলেও ভিন্ন দলের নীতি নিয়ন্ত্রিত করা যায়। এই বিশ্বাস থেকেই তারা ব্রিটিশ ভারতে নিজেদের সদস্যদের মুসলিম লীগে ঢুকিয়েছে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দান বা নীতি নিয়ন্ত্রণের আশায়। শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সেই সদস্যই হারিয়ে গেছে। একই বিশ্বাস থেকে এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাপে ঢুকেছে। ন্যাপের নেতৃত্ব করেছে। শেষ পর্যন্ত আর কমিউনিস্ট পার্টিতে ফিরে আসেনি। যদিও এ ধরনের নীতি গ্রহণের ব্যাপারে আর একটি বিবেচনাও কাজ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকা এবং নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় কমিউনিস্ট পার্টি এ নীতি গ্রহণ করেছিল।
আমাদের এ ব্যাপারে একেবারে বিপরীত নীতি ছিল। আমাদের দল কোনো দিন ভিন্ন দলের ছায়ায় কাজ করেনি। ভিন্ন ফ্রন্টে ভিন্ন দলের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করলেও দলের প্রশ্নে কোনো ভেজাল নীতি ছিল না। তাই কাগমারী সম্মেলনে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও দল হিসেবে আমরা যাইনি। আমাদের প্রবীণ নেতা প্রখ্যাত অতীন্দ্রমোহন রায় কাগমারী সম্মেলনে গিয়েছিলেন। তখনো মওলানা ভাসানী তাকে একসঙ্গে রাজনীতি করার কথা বলেছিলেন। অতীনদা বলেছিলেন, অন্য দলে ঢুকে নিজের দলের আদর্শ বাস্তবায়ন করা যায় না। সুতরাং রাজনীতি ও কৌশলের দিক থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের মৌলিক পার্থক্য ছিল।
জানতাম যে ন্যাপ গঠনের পর নতুন কোনো ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হোক এটা কমিউনিস্ট পার্টি চাইবে না এবং সে সংগঠনে আমার যাওয়াই সম্ভব হবে না। বাস্তবে তাই হয়েছিল। মওলানা ভাসানীর প্রচেষ্টা সফল হয়নি। আমারও পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
তবে ন্যাপ গঠনের পর বিপদ এল অন্যদিকে থেকে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী কংগ্রেস কোয়ালিশন সরকার। বিরোধী দলে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম। এ পরস্থিতিতে ন্যাপ যে দিকে ভোট দেবে সে সরকারই একমাত্র টিকে থাকবে। কারণ আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত অনেক পরিষদ সদস্যই তখন ন্যাপে যোগদান করেছে। অপরদিকে কেন্দ্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রীত্ব তখন টালমাটাল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাশ্চাত্য ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে তখন পাশ্চাত্য জগতে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলেন। কথা হচ্ছে ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ভয় ছিল পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলাদের। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচন তাদের আরো শঙ্কিত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে মুসলিম লীগ উচ্ছেদ হয়ে গেছে।
আমলাদের ভয় হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন হলে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। আমলাদের হাতের পাঁচ মুসলিম লীগ এবং ইস্কান্দার মীর্জার হাতে গড়া রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে লাপাত্তা হয়ে যেতে পারে। তাই মীর্জার নেতৃত্বে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হলো শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে। ৮০ সদস্যের সংসদে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ১২ সদস্যের নেতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন রিপাবলিকান পার্টির সমর্থনে। ইস্কান্দার মীর্জার ইঙ্গিতে একদিন সুপ্রভাতে রিপাবলিকান পার্টি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করল। অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন নেই এই অজুহাতে প্রেসিডেন্ট মির্জা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগের অনুরোধ জানালেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজি হলেন না। তিনি মির্জাকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকার পরামর্শ দিলেন। প্রেসিডেন্ট মির্জা রাজি হলেন না। পদচ্যুত হবার অপমানজনক পরিস্থিতি এড়াবার জন্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করলেন।
