এরপর আমাদের পক্ষে ছাত্রলীগে থাকা আদৌ সম্ভব হলো না। আমি এনায়েত উল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, নূরুল হক চৌধুরী (মেহেদী), আব্দুল হালিম, আনিসুর রহমান, জহিরুল ইসলামসহ ছ’টি জেলার ৬৮ জন নেতা ও কর্মী ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করি। ফরিদপুর এবং ময়মনসিংহ শাখা ছাত্রলীগ অবলুপ্ত হয়ে যায়।
এরপরে মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগে থাকা আর সম্ভব ছিল না। তিনি ১৩ ও ১৬ জুন দু’দিনব্যাপী ঢাকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এক বৈঠক ডাকেন। এ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ২৫ ও ২৬ জুলাই ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ মওলানা ভাসানী এবার পাকিস্তানভিত্তিক নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেবেন। মওলানা ভাসানীর সিদ্ধান্ত সেদিন আমাকে কৌতূহলী করেছিল, বিস্মিত করেনি।
আমি লক্ষ্য করছিলাম, দেশে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হতে যাচ্ছে। এ দলের প্রধান বক্তব্য হবে–সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ভাগ হচ্ছে। এমন ঘটনা পৃথিবীতে কমই ঘটেছে। এ কথা সত্য, সেকালের আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগ ভাঙনের বিরুদ্ধে ছিল–কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তাদের অনুসৃত নীতি এই ভাঙনের অন্যতম কারণ ছিল।
পৃথিবীর দেশে দেশে রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো এ নীতি অনুসরণ করেছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চরম বৈরী সম্পর্ক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে। পাশ্চাত্য শিবিরের উভয় পক্ষই তখন নিজের প্রভাব বলয় বিস্তারে ব্যস্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র বিশ্বে তার প্রভাব বিস্তারের জন্যে আগ্রাসী অভিযান শুরু করেছিল। বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি শ্লোগান দিচ্ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন ছিল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রধান কর্মসূচি। এই ঢাকার বুকে দেখা গেছে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব, ফস্টার যালেস ঢাকা সফরে এলে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল।
স্বাধীন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য। কিন্তু শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে একটি দল ভাঙা বা নতুন দল গড়া অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে অন্ধভাবে অনুসরণের ফল। কারণ একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি সে দেশের অভ্যন্তরের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়। শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের বা সরকারের প্রগতিশীলতার মাপকাঠি নয়। সেকালে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়েছিল। জন্মলগ্নেই ভারত কিছুটা শিল্পোন্নত ছিল। ভারতে প্রভাবশালী পুঁজিপতি ছিল। মার্কিন বা সোভিয়েত শিবিরে না গিয়ে মাঝখানে থেকে দরকষাকষি করাই ছিল তার পক্ষে লাভজনক। এই দরকষাকষির শক্তি পাকিস্তানের ছিল না। আবার পররাষ্ট্রনীতি জোটনিরপেক্ষ হলেই যে প্রগতিশীল হয় না, তার প্রমাণ মিসর। বিদেশনীতির ক্ষেত্রে মিসর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে সমর্থন করেছে। আবার চরম নির্যাতন করেছে নিজের দেশের কমিউনিস্টদের। ভারত জোটনিরপেক্ষ হলেও চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ডেকে এনেছে। সুতরাং জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করলেই কোনো সরকার বা দল প্রগতিশীল হবে এ কথা বলার অবকাশ নেই। তাই শুধু জোটনিরপেক্ষ নীতির ওপর ভিত্তি করে কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা একান্তই অবৈজ্ঞানিক। কারণ প্রতিটি দল একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই শ্রেণির স্বার্থ ভিত্তি করেই দলের নীতি নির্ধারিত হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি অর্থাৎ ন্যাপ নামে যে সংগঠনটি মওলানা ভাসানী যাদের নিয়ে গঠন করলেন তাদের শ্রেণি চরিত্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের শ্রেণি চরিত্রের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। ন্যাপে এসেছিলেন পাঞ্জাবের জননেতা মিঞা ইফতেখার উদ্দিন আহমদ, সিন্ধুর জিএম সৈয়দ, বেলুচিস্তানের আব্দুস সামাদ, সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফফার খান। শ্রেণি চরিত্রের দিক থেকে এদের মধ্যে অধিকাংশই সামন্তবাদী ধ্যানধারণারই মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনেও এঁরা একান্তভাবেই জমিদার শ্রেণির অর্থাৎ মওলানা ভাসানী যে দলটি গড়েছিলেন সে দলটি আদৌ শ্রেণি চরিত্রের বিষয়ে আওয়ামী লীগ থেকে পৃথক ছিল না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের এই বিভাজন ছিল অবৈজ্ঞানিক ও অনভিপ্রেত এবং রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক নীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। আমার ধারণা মস্কোর নেতারা তখনো এ ব্যাপারে তত সতর্ক ছিলেন না। ১৯৫৩ সালে স্টালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিতে অনেক পরিবর্তন হচ্ছিল। সেই পরিবর্তনের হাওয়া পূর্ব পাকিস্তান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। পৌঁছালে হয়তো বা সেদিন আওয়ামী লীগ শ্রেণিচরিত্রের প্রশ্ন বিবেচনা না করে শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন দল গঠন করত না। এটি যে সঠিক ছিল না তা প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তীকালে। যতদিন সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন ছিল ততদিন পর্যন্ত ন্যাপ সজীব এবং সচল ছিল। পরবর্তীকালে অধিকাংশ ন্যাপ নেতা আওয়ামী লীগে ফিরে গিয়েছিলেন এবং এক সময় এই ন্যাপ নেতারা কাগজপত্রে এবং দলিলে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বাকশাল গঠন করেছিলেন। অথচ এঁরাই ১৯৫৭ সালে শেখ সাহেবকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাপ গঠন করেন। আমার ধারণা, সেকালে আওয়ামী লীগে ভাঙন এবং ন্যাপ গঠনের জন্যে দায়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির অন্ধ অনুসরণ এবং এ কাজটি করেছেন কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা।
