তবুও গণ্ডগোল দেখা দিল পরবর্তী সময়ে কাগমারীতে আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন নিয়ে। আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন মওলানা ভাসানী।
এই সম্মেলনে তিনি ভারত এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষাবিদ এবং সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। আর তখনই কাগমারী সম্মেলনে এসেছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী আবদুল ওয়াদুদ, সুফিয়া ওয়াদিয়া, পরোধ স্যানাল, রাধা রাণী দেবী প্রমুখ। কাগমারী সম্মেলন উপলক্ষে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম, আব্রাহাম লিংকন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, তিতুমীর, হাকিম আজমল খান, লেনিন, শেক্সপিয়রসহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নামে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল।
এই তোরণ নির্মাণের ফলে মওলানা ভাসানীকে ভারতীয় এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করা হয়। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে দৈনিক ইত্তেফাক বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগে ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ছিল যে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সামরিক চুক্তির বিরোধিতা করলেও ওয়ার্কিং কমিটিতে সে প্রস্তাব কোনোদিনও গৃহীত হতো না। মওলানা ভাসানী সামরিক চুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন। কিন্তু বৈঠকে কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হতো না। অধিকাংশ সভায় তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে নিজের ভাষণের পর বৈঠক ত্যাগ করতেন। ফলে তার সমর্থকরা কোনোদিনই বৈঠকে এ ধরনের প্রস্তাব মানতেই সাহস পেতেন না। শেষ পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান যে ধরনের প্রস্তাব চাইতেন সে ধরনের প্রস্তাবই গৃহীত হতো। এবারও কাগমারী সম্মেলনে তাই ঘটল। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হলো না। কোন্দল চূড়ান্ত রূপ নিলো আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন নিয়ে। কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ১৬ মার্চ লিখিতভাবে পদত্যাগ করলেন।
আওয়ামী লীগ থেকে মওলানা ভাসানীর পদতাগপত্র দেবার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ একশ্রেণির আওয়ামী লীগ নেতার ধারণা হলো যে এর পেছনে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির অনুপ্রবেশকারী বামপন্থী নেতারা দায়ী। এঁদের অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আছে এবং এদের নেতৃত্ব করছেন সংগঠনের সম্পাদক অলি আহাদ। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসল ৩০ মার্চ। অলি আহাদের বিরুদ্ধে সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হলো। প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করলেন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান। এ অধিবেশনে অলি আহাদ পাল্টা অভিযোগ আনেন মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার জন্যে। পরে বৈঠক মুলতুবি হয়ে যায়। বিকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মনসুর আহমেদ। তিনি নিজে প্রস্তাব উত্থাপন করে অলি আহাদকে বরখাস্ত করেন। এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আব্দুস সামাদ আজাদসহ ৯ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। উপস্থিত ৩০ জন সদস্যের মধ্যে ১৪ জন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
মওলানা ভাসানী তখন ফতুল্লা ঘাটে নৌকায় অবস্থান করছিলেন। অলি আহাদসহ বিক্ষুব্ধ সদস্যগণ মওলানা সাহেবের কাছে গিয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডেকে সমস্যা মোকাবেলার আহ্বান জানান। মওলানা সাহেব তাতে রাজি হলেন না। তিনি ৩১ মার্চ রোববার নারায়ণগঞ্জে জনসভা করার নির্দেশ দেন। ১৮ ও ১৯ মে বগুড়ায় কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত আত্মশুদ্ধির জন্যে অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। মওলানা ভাসানী ১ জুন অনশন শুরু করলে ৩ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসে। এবার তিন বছরের জন্যে অলি আহাদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। পদত্যাগী ৯৯ জন সদস্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নতুন ৯ জন কো-অপট করা হয়।
মওলানা সাহেব জানান, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আলোচনা হলেই তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের প্রশ্ন উঠতে পারে-এই পটভূমিতে ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার পিকচার প্যালেসে (পাকিস্তান সিনেমা হল) আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। কাউন্সিলের আলোচ্য বিষয় অলি আহাদকে বহিষ্কার, সামরিক চুক্তি, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, খাদ্যশস্য মূল্যবৃদ্ধি তথা মওলানা ভাসানীর অনশন।
এবারও সেই এক ঘটনা ঘটল। মওলানা সাহেব অধিবেশনের প্রথমে নিজস্ব বক্তব্য দিয়ে হল ত্যাগ করেন। সম্মেলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতিসহ সবকিছু গৃহীত হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের সদস্যরা মওলানা ভাসানীর সমর্থকদের ওপরে হামলা চালায়। মারামারির পর বরিশাল ছাত্রলীগের কতিপয় সদস্য ঢাকা হলে আমার কক্ষে আসে এবং বীরবিক্রমে তাদের ভূমিকা বর্ণনা করতে থাকে। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এবার আওয়ামী লীগ দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ জুন বিকালে পল্টন ময়দানে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘোষণা করেন, পূর্ব পাকিস্তান শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে।
