আমি বললাম, এ সিদ্ধান্তে আমি একমত নই। কোনো সংখ্যালঘু হল করা যাবে না। আমাদের মূল দাবি ছিল সকল হলকে কসমোপলিটন করা। আবার এখন আমরা দাবি করছি জগন্নাথ হলকে সংখ্যালঘু হল করার। এ দাবি মূল দাবির সঙ্গে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমার সকল বন্ধু খুশি না হলেও আমার প্রস্তাব সবাই মেনে নিল।
সন্ধ্যার দিকে ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি একটি নতুন প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, নির্মল, তোর সেদিনের কথায় আমি বিবেকের দংশন অনুভব করেছি। আমরা জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন করেছি। অথচ এসএম হলের স্ট্যাচুট পরির্বন করতে পারছি না। এই বৈপরীত্য চলতে পারে না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট আবার পাল্টে দেব। জগন্নাথ হল আবার হিন্দু ছাত্রদের হল হবে। আমি বললাম, স্যার, এ প্রস্তাব আমি মানব না। আমরা সকল হলকে কসমোপলিটন করার কথা বলেছি। জগন্নাথ হলকে নতুন করে হিন্দু হল বানাতে চাই না। তিনি বললেন, নির্মল তুই বুঝবার চেষ্টা কর। এদেশে হিন্দু ছাত্রদের সংখ্যা কোনোদিন বৃদ্ধি পাবে না। জগন্নাথ হলের সিট খালি থাকবে। মুসলমান ছাত্ররা দাবি তুলবে আমরা ঐ সিটে থাকব। একদিন দেখবি এসএম হলের ছাত্ররা জগন্নাথ হল দখল নিয়ে গেছে। ওরা বলবে, শুধুমাত্র অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে নয়, সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে জগন্নাথ হলের দুয়ার মুক্ত থাক। বিচারপতি ইব্রাহিম জোর দিয়ে বললেন–আমি এ পথ বন্ধ করে দিয়ে যেতে চাই। তুই রাজি হয়ে যা। আমি বললাম, কিছুতেই রাজি হব না। এবার তিনি আমাকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন-তুই কি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু ছাত্রদের প্রতিনিধি? আমি বললাম না। আমি শুধু ঢাকা হলের ছাত্রদের প্রতিনিধি।
বিচারপতি ইব্রাহিম এরপর তেমন কোনো কথা বললেন না। শুধু বললেন, ঠিকমতো তোর কথা ভেবে দেখব। বললেন, তোর একটা কাজ আছে। আগামীকাল ভোরে ঢাকা হলের প্রতিনিধিরা জগন্নাথ হলে যাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা থাকবে। সব মাপজোক করবে। কক্ষগুলোতে বাতাস ঢুকবার জন্যে দেয়াল কেটে ঘুলঘুলি করা হবে। কোথায় কমনরুম ক্যান্টিন হবে তাও ঠিক করা হবে। আমি বললাম, দক্ষিণের রেজিস্ট্রি অফিস ও এসেম্বলি অফিস কী হবে। তিনি বললেন, কালক্রমে হলগুলো তোরা পেয়ে যাবি।
পরদিন সবাই মিলে জগন্নাথ হলে গেলাম। প্রকৌশলীরা এলেন। সব মাপজোক শুরু হলো। জগন্নাথ হলে খাওয়া আর ঢাকা হলে থাকার পালা। এ ব্যাপারে ভাগাভাগি হয়ে গেল। আমরা ৭০ থেকে ৭৫ জন ছাত্র ঢাকা হলে থেকে গেলাম। বাদ বাকি সকলেই চলে গেল জগন্নাথ হলে। এ ব্যাপারেও কৌশল গ্রহণ করলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নতুন যারা ভর্তি হতে এসেছিল সেই সংখ্যালঘু ছাত্রদের ঢাকা হলে ভর্তির ফরম দেয়া হলো না। প্রায় সকলকেই বাধ্য করা হলো জগন্নাথ হল থেকে ভর্তির ফরম কিনতে।
সেদিন আমার এবং আমাদের এ সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা এ নিয়ে পরবর্তীকালে প্রশ্ন উঠেছিল। জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের প্রথম অভিষেক অনুষ্ঠানে আমি তিরস্কৃত হয়েছিলাম বিপ্লবী ছাত্রনেতা বলে। বলা হয়েছিল আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেছিলাম। আমি ভিন্ন অবস্থান নিলে সংখ্যালঘু ছাত্ররা অনেক কিছু পেত। আমার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জগন্নাথ হলের একটি বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ঐ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন হলের প্রভোস্ট ড. গোবিন্দ দেব। প্রধান অতিথি ছিলেন সামরিক শাসনের ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি হামিদুর রহমান। আমি তখন ঢাকা হলের ছাত্র। এই বিচারপতি হামিদুর রহমানের আমলেই আমাকে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে ঢাকা হল ছাড়তে বলা হয়েছিল। আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল কলাভবনে। অজুহাত, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র সুতরাং আমাকে কার্জন হলের চৌহদ্দিতেই থাকতে হবে। এভাবে জগন্নাথ হলের ইতিহাসের প্রথম পর্ব শেষ হলো। পরবর্তীকালে ঢাকা হলে অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে দিনগুলো ছিল নিদারুন দুঃখজনক। সে কাহিনী পরে বলছি।
ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগে নতুন সঙ্কট দেখা দিল পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সকল ধরনের সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে। প্রথম থেকে আওয়ামী লীগ বাগদাদ চুক্তি ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার চুক্তির (সিটো) বিরোধী। পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতানৈক্য ছিল। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পূর্বে এ নিয়ে সংকট দেখা দেয়নি। সংকট দেখা দিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পর।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুয়েজনীতি সকল মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এসে ১৯৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে এক ভাষণ দিলেন। তিনি প্রকাশ্যেই সামরিক চুক্তির সমর্থন করলেন। এ পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করলেন। কাউন্সিল পূর্ববর্তী ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসল ৬ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেল, এই কমিটির বৈঠকে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে একটি অভিনব প্রস্তাব গৃহীত হলো। প্রস্তাবে বলা হলো কাউন্সিলে সামরিক চুক্তি সম্পর্কে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। প্রস্তাবের পক্ষে ৩৫ ভোট এবং বিপক্ষে ১ ভোট পড়লো। এই ভোটটি দিয়েছিলেন অলি আহাদ, যিনি পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
