শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। অনশনের ৫ম দিনে তিনি আমাদের দেখতে এলেন। শেরেবাংলা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। তাই কথায় কথায় বলতেন–আমি তোমাদের সব দাবি মেনে নিচ্ছি। তোমরা অনশন বন্ধ করো। শেরেবাংলার সঙ্গে তখন অসংখ্য তোক ঢাকা হলে। লোকে লোকারণ্য। আমি শেরেবাংলাকে বললাম, আমি আপনাকে শৈশব থেকে চিনি। শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বিশ্বাস করি না। আমি জানি একথা আপনি রাখতে পারবেন না। আমার কথায় সবাই যেন চমকে উঠলেন। কেউ কোনো কথা বললেন না। শেরেবাংলা সদলবলে ঢাকা হল থেকে সলিমুল্লাহ হলে চলে গেলেন। পরে শুনলাম তিনি সলিমুল্লাহ হলে এক ছাত্রসভা করেছেন। আমার আচরণের কথা বলেছেন। ছাত্ররা নাকি বলেছে-সলিমুল্লাহ হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন হবে একমাত্র রক্তের বিনিময়ে। অর্থাৎ অবস্থা আরো ঘোলাটে হয়ে উঠল।
সন্ধ্যার সময় ভাইস চ্যান্সেলর অফিস থেকে এক ভভদ্রলোক এসে আরেক খবর দিয়ে গেলেন। খবরটি হচ্ছে আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারেরা নাকি রিপোর্ট দিয়েছে আমার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। তাই ভাইস চ্যান্সেলর একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডেকেছিলেন। একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যরা নাকি একবাক্যে বলেছেন, তাঁদের করার কিছু নেই। আর আমার সম্পর্কে বলেছেনLet him die peacefully. এ খবর কতটুকু সত্য আমি কোনোদিন যাচাই করার চেষ্টা করিনি। তবে আমাকে নিয়ে যে ইব্রাহিম সাহেব চিন্তিত ছিলেন তা আমি বিশ্বাস করি। তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিন ধরে।
অনশনের ৬ষ্ঠ দিনে তেমন কিছু ঘটল না। চারিদিকে চুপচাপ। মনোরঞ্জন বাবু ও শরৎ বাবু এসে আমাদের দেখে গেলেন। কোনো মহলে কোনো উচ্চবাক্য নেই। অনশনের ৭ম দিনের সন্ধ্যাবেলা দলবল নিয়ে উপস্থিত হলেন বিচারপতি ইব্রাহিম। তাঁর কাছে নাকি খবর গেছে আমার অবস্থা ভালো নয়। চিকিৎসকরা আমার দায়িত্ব নিতে রাজি নন। কক্ষে ঢুকেই ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, নির্মল, বলো তো আমি কে? আমি বললাম, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ভাইস চ্যান্সেলর মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে শ্রদ্ধা করো? আমি বললাম, করি। বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, তাহলে আমার নির্দেশ, আজকে তুমি কোনো কথা বলতে পারবে না। আমি বললাম, তা হতে পারে না।
ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম আঁটঘাট বেঁধেই এসেছিলেন। তিনি শুনেছিলেন আমার অবস্থা খারাপ। ডাক্তাররা কোনো দায়িত্ব নেবে না। আমার হাসি পাচ্ছিল। কারণ ৭ দিনের অনশনে আমার কিছুই হয় না। ১৯৪৯ সালে ঢাকা জেলে শুধু জল খেয়ে ১১ দিন ছিলাম। অনশন আমার কোনোদিনই কষ্টকর মনে হয়নি। মনোবল থাকলে অনশনে কিছুই হয় না। তাই ডাক্তারের রিপোর্ট সত্ত্বেও আমি আদৌ শঙ্কিত ছিলাম না। ভাইস চ্যান্সেলর ইব্রাহিম বললেন, নির্মল, আমি ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নির্দেশ দিচ্ছি আজ তুমি কোনো কথা বলতে পারবে না। তুমি অসুস্থ। আমি বললাম, আপনার নির্দেশ আমাদের স্বার্থের বাইরে যাচ্ছে। আমাকে কথা বলতে হবেই। আমার কথার প্রতিবাদ করলেন সকল প্রভোস্ট একযোগে। তারা বললেন, তুমি বলছো তুমি ভাইস চ্যান্সেলরকে সম্মান করো। তাই তার নির্দেশ তোমাকে মানতে হবে। নইলে ভাইস চ্যান্সেলরকে অসম্মান করা হবে। আমার ঢাকা হলের বন্ধুরা আমাকে চুপ থাকতে বলল। এবার কথা শুরু করলেন ভাইস চ্যান্সেলর মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, সেই আগের একই কথা–সংখ্যালঘু ছাত্রদের জন্যে সবকিছু করা হবে। তোমরা অনশন প্রত্যাহার করো। আমি বললাম, এমন কথায় কিছু হবে না। ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে আবার চুপ থাকার কথা বললেন। তিনি বললেন, তোমাদের সকলকে জগন্নাথ হলে যেতে হবে না। যাদের খুশি তারা জগন্নাথ হলে যাবে। যারা ঢাকা হলে থাকতে চায় তারা ঢাকা হলেই থাকবে। জগন্নাথ হল সংস্কার করা হবে। জল, আলো, ক্যান্টিন কমনরুমের ব্যবস্থা করা হবে। আমি কথা দিচ্ছি, আমি ভাইস চ্যান্সেলর থাকলে ইকবাল হল কসমোপলিটন হল হবে। জগন্নাথ হলের রেজিস্ট্রার অফিস ও মিলনায়তন তোমরা একদিন পাবে।
আমি লক্ষ করলাম, আমাদের ঢাকা হলের ছাত্র বন্ধুরা অনেক নমনীয়। তারা অনশন অব্যাহত রাখতে সাহস পাচ্ছিল না। সকলেই অনশন ভাঙতে নিমরাজি। ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে সকল হলের প্রভোস্টরা প্রতিশ্রুতি দেয়ায় অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলো। আমি কিছুই করলাম না। ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, তুই কাল সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে যাবি। আমি বললাম, আমার সময় হবে না। আমি আগামীকাল কুমিল্লা যাবো। কুমিল্লায় আমার দলের বৈঠক আছে। অনশন প্রত্যাহারের পর অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর এলেন। তিনি অনশন প্রত্যাহারের কথা জানতেন না। বললেন, এত তাড়াতাড়ি অনশন প্রত্যাহার করলেন কেন? আমরা তো আলোচনা শুরু করেছিলাম। আমার কথার কিছু ছিল না। আমি পরের দিন ঐ শরীর নিয়েই ট্রেনে কুমিল্লা চলে গেলাম। দু’দিন পরে ঢাকা ফিরলাম।
ঢাকা এসে দেখি পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিয়েছে। ঢাকা হলের ছাত্ররা এক নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, জগন্নাথ হলকে সংখ্যালঘু হল হিসেবে ঘোষণা করা হোক। ঐ হলটিতে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্ররাই থাকবে। তাদের আশঙ্কা হচ্ছে–জগন্নাথ হল অমুসলমান কসমোপলিটন থাকলে একদিন ভবিষ্যতে আবার হয়তো নতুন দাবি উঠবে। মুসলমান ছাত্ররা বলবে ঐ হলকে কসমোপলিটন করা হোক। সকল ছাত্রকে ঐ হলে থাকতে দিতে হবে।
