বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, কোনো হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে অনেক ঝামেলা হবে। আমি বললাম–স্যার আপনার কথা সত্য নয়। ইচ্ছা হলেই আপনারা স্ট্যাচুট পাল্টাতে পারেন। আপনারা জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পাল্টিয়েছেন। স্ট্যাচুট অনুযায়ী জগন্নাথ হল শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের জন্যে সংরক্ষিত ছিল। স্ট্যাচুট পাল্টে আপনারা জগন্নাথ হলকে অমুসলমান হলে পরিণত করেছেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জগন্নাথ হলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তিন সম্প্রদায়ের ছাত্ররাই থাকতে পারবে। তাই জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পাল্টানো গেলে সলিমুল্লাহ হল ও ফজলুল হক হলের স্ট্যাচুট কেন পাল্টানো যাবে না?
ইব্রাহিম সাহেব চুপ করে গেলেন। বললেন, তুমি এত কথা জানলে কী করে। বললাম, স্যার, আপনাদের লাল বইটা দেখেছি। আপনাদের লাল বই আমাদের দেখা নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদেরও উপায় ছিল না। তাছাড়া আমাদের ভিন্ন যুক্তি আছে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সম্পর্কে। পাকিস্তানের সংবিধানে আছে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সাহায্য পেলে সেই প্রতিষ্ঠানে কোনো সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীকে প্রবেশে বাধা দেয়া যাবে না। সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীকে থাকবার এবং পড়বার সুযোগ দিতে হবে। ইকবাল হলে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ১২ লাখ টাকা সাহায্য দিয়েছে। তাই ইকবাল হলের দুয়ার আমাদের জন্যে খুলে দিতে হবে। এর পরেও কথা আছে। জগন্নাথ হল এখনও মানুষের বাসোপযোগী নয়। জগন্নাথ হল এ মুহূর্তে কতগুলো পায়রার খোপের সমষ্টি। ওই হলে ছাত্রদের যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
এরপরে আর আলোচনা জমল না। ভাইস চ্যান্সেলর নীরব হয়ে গেলেন। বিদায় নেবার পূর্বে আবার অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানালেন। অনশনের তৃতীয় দিনে অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর এলেন। তিনি খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বললেন–ঠিক আছে অনশন যখন শুরু করেছেন চালিয়ে যান। দেখি কতদূর কী করা যায়। কিছুক্ষণ পর দেখা করতে এলেন আর একজন মন্ত্রী-কংগ্রেসের শরৎ মজুমদার। তিনিও সমর্থন জানিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে এলেন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ফণীভূষণ মজুমদার। তাকে খুব চিন্তিত মনে হলো। তিনি বললেন, কী করবে? তোমার বাড়ি থেকে তোমার অবস্থা জানতে চেয়েছে। আমি বললাম, ভাববার কিছু নেই। বাড়িতে একটা টেলিগ্রাম করে দিন।
অনশনের চতুর্থ দিনে হাওয়া পরিবর্তন হতে শুরু হলো। আমাকে জানানো হলো ঢাকার আদিবাসীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করেছে। তারা নাকি বলেছে দেশের হিন্দুরা তো এমনিতেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। বাকি আছে টাকা হলে শ’তিনেক ছাত্র। এদের সমস্যা তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক। এক বন্ধু এসে জানিয়ে গেল ঢাকা হলের অনশন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক যুগান্তরে সম্পাদকীয় বেরিয়েছে। বলা হয়েছে, এই অনশন নিয়ে অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে পশ্চিমবাংলায় তার প্রতিক্রিয়া হবে। সন্ধ্যার দিকে সেকালের সমাজতন্ত্রী দলের নেতা অধ্যাপক পুলিন দে এলেন। তিনি বললেন–নারায়ণগঞ্জের হিন্দু ব্যবসায়ীরা একটি ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব হচ্ছে–তারা টাকা দিয়ে পুরো ঢাকা হল কিনে ফেলবে। হলটি হিন্দু ছাত্রদের জন্যেই থাকবে। অথবা হলের মাঝখানে একটি দেয়াল দেয়া হবে। পশ্চিম দিকে থাকবে অমুসলমান ছাত্ররা। পূর্ব দিকে থাকবে ফজলুল হক হল এক্সেটেনশন। যেমন আছে তেমন।
পুলিন বাবুর প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম না। বললাম, সংগ্রাম আমাদেরই করতে দিন। কারো সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন নেই। আমি তখন বিব্রত বোধ করছিলাম চারদিক থেকে। চারিদিকে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ। ঢাকা হলের ছাত্ররা ক্লাসে যাচ্ছে না। শুনেছি মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের বাসভবনে। ছাত্রলীগ নেতাদের বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকের ফলাফল একান্তই আমাদের বিপক্ষে। আমি কাউকে কিছু বলতে পারছিলাম না। ভয় পাচ্ছিলাম। আমার কথা শুনলেই সবাই আরো ভয় পেয়ে যাবে। সকলের মন ভেঙে যাবে। আমার এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা প্রচার করছে নির্মল সেনও সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। সেও হিন্দু ছাত্রদের জন্য অনশন শুরু করেছে। বড় বড় কথা বললেও নির্মল সেনও শেষ পর্যন্ত হিন্দু।
এ পরিস্থিতি আমাকে বারবার মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমি যখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্যে সংগ্রাম করেছি তখন এ প্রশ্ন ওঠেনি। আমি ন্যাশনাল মেডিক্যাল ছাত্রদের জন্যে সংগ্রাম করেছি। তল্কালীন এলএমএফ ছাত্রদের দাবির সমর্থনে অনশন করতে ময়মনসিংহ গিয়েছি। রাজশাহীতে গিয়েছি। তখনও প্রশ্ন ওঠেনি। আমার অসুবিধা ছিল আমাদের দল আরএসপি’র এককালে পূর্ব পাকিস্তানে বড় সংগঠন থাকলেও দেশ বিভাগের পরে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। ছাত্রফ্রন্টে আমার সহযোগি ছিল ছাত্রলীগ। সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে তারা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। ছাত্র ইউনিয়ন কথাবার্তায়, চলনে-বলনে অসাম্প্রদায়িক হলেও সামনাসামনি প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে অবস্থান নিতে পারত না। তাদের ছিল নিদারুণ দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব। তাই তকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলি আক্কাস আমাকে প্রতিদিন এসে খবর দিলেও প্রকাশ্যে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি ছাত্র ইউনিয়ন। ফলে সে সময় আমাকে বড্ড নিঃসঙ্গ মনে হতো। বলার মতো একটি মানুষ আমি খুঁজে পাইনি। এর মধ্যে অনশনের ৫ম দিনে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল।
