এভাবে চারিদিকে প্রচারণা করে ঢাকা হলের ছাত্রদের চরমপথ গ্রহণে বাধ্য করা হলো। এসময় অনশন ধর্মঘট করতে বাধ্য হলাম। সিদ্ধান্ত হলো প্রথম দিন ছ’জন ছাত্র অনশনে যাবে। এরা দুর্বল হলে তরল জাতীয় কিছু গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় দিন আমি অনশনে যোগ দেব। আমার অনশন হবে একান্তই কোনো কিছু না খেয়ে।
এ ধরনের অনশন করার অভ্যাস আমার হয়েছিল জেলখানায়। ১৯৪৮ ৪৯-৫০ সালে ঢাকা জেলে চারবার অনশন করেছিলাম। ৬ দিন, ২৪ দিন, ৪০ দিন এবং ৫০ দিন। অনশনের ফলে অসুস্থ হয়েছিলাম, যে অসুখের ঐতিহ্য বহন করে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। তাই ১৯৫৭ সালে অনশনে যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন ছিল না। আর আমাকে বারণ করারও কেউ ছিল না। ১৯৪৮ সালে মা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেন। গোপালগঞ্জের গ্রামে বাবা আছেন। দু’কাকা আছেন টুঙ্গিপাড়ায়। জেলে থাকতে থাকতে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর। আর তারা কোনোদিনই আমার কোনো সিদ্ধান্তে বাধা দেননি।
প্রথমদিকে ৬ জন ছাত্র অনশন শুরু করে। দ্বিতীয় দিনে আমাকে নিয়ে ৭ জন। চারদিকে একটি থমথমে ভাব। ঢাকা হলের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। একটি দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বত্রই যেন একটা সাম্প্রদায়িক মনোভাব। মনে হয় ঢাকা হলের সংখ্যালঘু ছাত্ররা একটা অন্যায় কাজ করছে। ঢাকা হলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তিন সম্প্রদায়ের ছাত্র থাকলেও চিহ্নিত হচ্ছে হিন্দু হল বলে। সুতরাং হিন্দু হলের ছাত্রদের আন্দোলন নিশ্চয়ই হবে সাম্প্রদায়িক। প্রকৃতপক্ষে তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন একটি বিবৃতি দেয়া ছাড়া কোনো ছাত্র সংগঠনই আমাদের আন্দোলনের পক্ষে এগিয়ে আসেনি। তারা বিক্ষুব্ধ। কারণ আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায় এবং আমি ছাত্রলীগের সদস্য হয়েও ঐ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছি।
অনশনের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যাবেলায় ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিম আমাদের দেখতে এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সকল হলের প্রভোস্ট। প্রভোস্টদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। তিনি ঢাকা হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট ছিলেন। নতুন পরিস্থিতিতে তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট নিযুক্ত হয়েছেন। নতুন পদ পেয়ে তিনি খুশি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বোঝাতে চাচ্ছিলেন, ঢাকা হল মুসলিম হল হয়ে যাক। জগন্নাথ হলকে অমুসলমানদের হল হিসেবে চালু করা হোক। একটু দেনদরবার করতে পারলে এ পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ছাত্ররা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু ছাত্রদের সংখ্যা আর বৃদ্ধি পাবে না। এবার সুযোগ হারালে সংখ্যালঘু ছাত্ররা আর কোনদিন সুযোগ-সুবিধা পাবে না। ড, গোবিন্দ দেবের মতে আমরা একমত হতে পারিনি। তিনি আমাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে জগন্নাথ হলের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি তখন আমাদের কাছে ছিলেন অসহায়। তাই ভাইস চ্যান্সেলর আমাদের কক্ষে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, ড, গোবিন্দ দেব থাকলে আপনাদের সঙ্গে কোনো কথা হবে না। তাঁকে চলে যেতে হবে। তিনি অসম্মানিত হলে আমরা দায়ী থাকব না। ড. গোবিন্দ দেব হতচকিত হয়ে গেলেন এবং কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে গেলেন।
ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে ছিলেন ঢাকা হলের নবনিযুক্ত প্রভোস্ট এম এন কিউ জুলফিকার আলি। বছর খানেক আগে তিনি ঢাকা হলে প্রভোস্ট হয়েছেন। কিন্তু আমরা তাঁকে কোনোদিন হলে ঢুকতে দিইনি। আমি বললাম, জুলফিকার আলি সাহেবকে আমরা হলের প্রভোস্ট মানি না। তিনিও কক্ষে থাকলে কোনো আলোচনা হবে না। তাকেও চলে যেতে হবে। তিনিও চলে গেলেন।
এবার আলোচনা শুরু হলো। বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, Best of the things will be done for the minority students. তাঁর কথাগুলো এখনও আমার কানে ভাসছে। তিনি বললেন, তোমরা অনশন করছ। আমরা তোমাদের সব দাবি মেনে নেব। তোমরা অনশন প্রত্যাহার করো। আলোচনায় আমাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন ঢাকা জগন্নাথ হল সভাপতি তরুণ সেন। সাধারণ সম্পাদক শিশির দাস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এককালীন প্রধান দেবপ্রিয় বড়ুয়া এবং পদার্থবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. অজয় রায়।
বিচারপতি ইব্রাহিমকে আমি বললাম, স্যার, আমার একটি কথার জবাব দিতে হবে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। এ হলে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের থাকার অধিকার আছে। আপনারা কোন যুক্তিতে এ হলের হিন্দু ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে জগন্নাথ হলে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন? আমি ঢাকা হলে থাকব কি-না সে সিদ্ধান্ত আমি নেব। আমার ওপর কোনো অধিকার আপনাদের নেই।
বিচারপতি ইব্রাহিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, এ নির্দেশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এবার তোমরা যারা খুশি এখানে থাকবে এবং যারা খুশি জগন্নাথ হলে যাবে। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই। আমি প্রবাসে থাকাকালীন এ নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। এ নির্দেশ আর কার্যকর নয়। আমি বললাম, আমাদের মূল দাবি হচ্ছে ঢাকা হলের মতো সব হলকে কসমোপলিটন করতে হবে। সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো হল থাকতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্যে সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো ছাত্রী নিবাস নেই। তাই ছাত্রদের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাই আমাদের দাবি স্ট্যাচুট পরিবর্তন করে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়া হোক। সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে এই হল দুটির দুয়ার খুলে দেয়া হোক।
