১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি হল ছিল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল), জগন্নাথ হল এবং ছাত্রলীগের জন্যে চামেলী হল (বর্তমানে রোকেয়া হল)। সলিমুল্লাহ হল ও ফজলুল হক হল মুসলমান ছাত্রদের জন্যে। জগন্নাথ হল হিন্দু ছাত্রদের জন্যে এবং ঢাকা হল ছিল সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে নির্দিষ্ট। তবে ঢাকা হলে কোনোদিন মুসলিম ছাত্র ভর্তি না থাকায় (শুধুমাত্র ড. শহীদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ শফিউল্লাহ কিছুদিনের জন্যে এ হলের ছাত্র হয়ে সলিমুল্লাহ হলে চলে যায়) ঢাকা হল শেষ পর্যন্ত অমুসলমান ছাত্রদের হলে পরিণত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর হিন্দু ছাত্র সংখ্যা হ্রাস পায়–এ সময় পাকিস্তান সরকার জগন্নাথ হলের উত্তরের বাড়িতে পোস্টমাস্টার জেনারেলের অফিস স্থাপন করে। দক্ষিণ বাড়িতে স্থাপিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অফিস-জগন্নাথ হল মিলনায়তন পরিণত হয় পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে। জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্রদের পাঠানো হয় ঢাকা হলে। ঢাকা হল পরিণত হয়। ঢাকা জগন্নাথ হলে। অমুসলমান ছাত্রসংখ্যা আরো হ্রাস পেলে ঢাকা হলের পূর্বের এলাকা দিয়ে দেয়া হলো ফজলুল হক হলকে। ফলে তখন নাম হয় ফজলুল হক হল এক্সটেনশন।
১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন যে জগন্নাথ হলকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে শুধুমাত্র উত্তর বাড়ি নিয়ে। দক্ষিণ বাড়িতে রেজিস্ট্রার অফিস থাকবে। তবে নতুন রেজিস্ট্রার ভবন নির্মিত হলে ঐ বাড়িও ছেড়ে দেয়া হবে। ঢাকা হলকে মুসলিম হলে পরিণত করা হবে। জগন্নাথ হলকে অমুসলমান ছাত্রদের ছাত্রাবাসে পরিণত করা হবে। ঢাকা হল মুসলিম হলে আর অমুসলমান ছাত্রদের চলে যেতে হবে জগন্নাথ হলে।
ঢাকা হলের ছাত্ররা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জেনকিনস। ঢাকা হলের একদল প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি জানালেন, তিনি নিজে খ্রিস্টান, তিনি সংখ্যালঘু ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধা জানেন। তাঁর ধারণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যালঘু ছাত্রদের সংখ্যা আর বৃদ্ধি পাবে না। অথচ মুসলিম ছাত্র সংখ্যা বাড়ছে–তাই অমুসলিম ছাত্রদের জগন্নাথ হলে যাওয়া উচিত। এ সময় গেলে তাদের অনেক সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। এ সিদ্ধান্তে রাজি হলে তারা অনেক ভালো করবে। ঢাকা হলের ছাত্রদের বক্তব্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে সম্প্রদায় ভিত্তিতে আনা চলবে না। সকল হল সকল সম্প্রদায়ের জন্যে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কোনো সম্প্রদায়ের জন্যে বিশেষ হল থাকতে পারে না। সকল হল হবে কসমোপলিটন। এ দাবি না মানা হলে ঢাকা হল যেমন আছে তেমন থাকবে। ড, জেনকিনস একমত হলেন না। তবে চলে যাবার পূর্বে ঢাকা হলকে মুসলিম হল করার পরিবর্তে কসমোপলিটন হল করার সিদ্ধান্ত দিয়ে গেলেন। তবে জগন্নাথ হল অমুসলমান ছাত্রদের হলে পরিণত করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।
ড. জেনকিনস চলে যাবার পর ভাইস চ্যান্সেলর হলেন। বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে তৎকালীন রেজিস্ট্রার হাদি তালুকদারের সুসম্পর্ক ছিল না। আমরা ইতিমধ্যে হল সম্পর্কে ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, ঢাকা হলের ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তীকালে সকল সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু ইব্রাহিম সাহেব চিকিৎসার জন্যে লন্ডন গেলে রেজিস্ট্রার হাদি তালুকদার এক অদ্ভুত নির্দেশ জারি করলেন ঢাকা হলের ছাত্রদের ওপর। যতদূর মনে আছে জুন মাসের শেষের দিকে এক নির্দেশ জারি করে বললেন, ঢাকা হলের সকল হিন্দু ছাত্রদের ১ জুলাইয়ের মধ্যে জগন্নাথ হলে চলে যেতে হবে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। এ হলে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের থাকবার অধিকার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষমতা নেই কাউকে নির্দেশ দিয়ে হল থেকে তাড়াবার। দ্বিতীয়ত জগন্নাথ হল তখন বাসযোগ্য ছিল না। দীর্ঘদিন পিএমজি থাকায় কোনো মেরামত হয়নি। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, জল নেই, ক্যান্টিন নেই, কমনরুম নেই, প্রভোস্ট অফিস নেই। একটি ছাত্রাবাসের জন্যে প্রয়োজনীয় কিছু নেই। একমাত্র লোভনীয় হচ্ছে প্রতিজন ছাত্রের জন্যে এক আসনের একটি কক্ষ। সর্বশেষ কথা হচ্ছে–ভাইস চ্যান্সেলর কথা দিয়েছিলেন, আলোচনার মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু সবকিছুই হলো একতরফা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, কেউই ঐ তারিখে ঢাকা হল ত্যাগ করব না।
আমরা সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। ভাইস চ্যান্সেলর ফিরে এলেন। তিনি বললেন, সকলকে জগন্নাথ হলে যেতে হবে না, যাদের খুশি তারা যাবে। আমরা বললাম, তাও হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হলকে ঢাকা হলের মতো কসমোপলিটন হল করতে হবে। আমরা সকল হলে থাকব। নইলে যে কোনোদিন যে কোনো হল থেকে আমাদের তাড়ানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা মানলেন না। মাঝখানে একদিন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অগ্নিযুগের অন্যতম বিপ্লবী রাজশাহীর প্রভাস লাহিড়ী আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি নাকি ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার এসএন মিত্রের সঙ্গে দেখা করেছ। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান এ অভিযোগ করেছেন। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি ভারতীয় হাইকমিশনের কাউকে চিনতাম না। শুধু জানতাম আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অনুকূল নয়। পরদিন ভোরে ইত্তেফাকে এ সম্পর্কে রাজনৈতিক মঞ্চে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার লিস্ট বের হলো। তিনি সরাসরি লিখলেন-একজন সংখ্যালঘু বিপ্লবী ছাত্রনেতা ঢাকা হল-জগন্নাথ হল নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারপর যা লিখবার সবই লেখা হয়েছিল ইত্তেফাকের পাতায়। শুধুমাত্র আমার প্রতিবাদ পত্রটি ছাপা হয়নি।
