তবে এর পরেও ঘটনার বাকি ছিল। একদিন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এম এ বারী এ টি আমার রুমে এলেন। আমাকে বললেন, আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সমাবেশ ডেকেছে ফজলুল হক হল, এসএম হল, ইকবাল হলের ছাত্র সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্টরা। আলোচনার বিষয়বস্তু মওলানা ভাসানীর কথিত বক্তব্য। এই ছাত্র নেতারা নাকি কাগমারীতে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন ইউরোপ সফর শেষে মাওলানা সাহেব মাত্র দেশে ফিরেছেন, তাই নাকি ছাত্র নেতাদের তাঁর কাছে যাওয়া। আলোচনাকালে মওলানা সাহেব নাকি ছাত্রনেতাদের কাছে ব্রিটিশ শ্রমিক দলের বামপন্থী নেতা বেভানের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেছিলেন। ঘটনটি নিম্নরূপ
মওলানা সাহেব আলোচনাকালে বেভানের কাছে কাশ্মীর সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের মতামত জানতে চান। বেভান নাকি বলেছিলেন, মওলানা, কাশ্মীর দিয়ে কী হবে, তোমরা পাকিস্তান চেয়ে ভুল করেছ।
মওলানা সাহেবের কাছে এই কথা শুনে ছাত্রনেতারা মওলানা ভাসানীকে জিজ্ঞাসা করেন, বেভান এ কথা বলার পর আপনি কী বললেন? মওলানা সাহেব নাকি জবাবে বলেছিলেন, আমার কী বলার আছে। বেভান ঠিকই তো বলেছে।
মওলানা সাহেবের কথায় ছাত্রনেতারা ক্ষুব্ধ হয়। তারা ঢাকায় এসে প্রচার শুরু করে যে, মওলানা ভাসানী পাকিস্তান বিদ্বেষী, ভারতীয় এজেন্ট। সুতরাং তার বিরুদ্ধে সভা সমাবেশের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা সাহেব তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি।
বারী সাহেব বললেন, কাল আমতলার সমাবেশে মারামারি হবে। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর অবস্থান দুই মেরুতে। তাই মওলানা ভাসানীকে হেনস্তা করা প্রয়োজন। নইলে এই তুচ্ছ ঘটনার জন্যে মওলানা সাহেবের কথিত উক্তির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ ডাকার কোনো কারণ ছিল না।
আমার কাছে ঘটনাটি স্পষ্ট হয়ে এল। বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ছাত্রলীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দী পন্থীরাই এ কাজটি করেছে। সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু আমি কী করবো। ছাত্রলীগ প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। আর সপ্তাহখানেক ধরে জ্বরে ভুগছি। আমাকে দেখার আমি ব্যতীত কেউ নেই। ইতোমধ্যে আমাকে শুনতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তীকালে ন্যাপ নেতাদের হস্তক্ষেপে আমি ছাত্রলীগের সম্পাদক হতে পারিনি। তাদের বক্তব্য, নির্মল সেন হিন্দু। তাই দেশের সবচে’ বড় ছাত্র প্রতিষ্ঠানের নেতা হিন্দু হলে কাশ্মীর এবং অন্যান্য প্রশ্নে নাকি অসুবিধা হবে। এ যুক্তি দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভেতরের এবং বাইরের বামপন্থী নেতারা। ডানপন্থীরা নন। এবার আবার সেই ডানপন্থী-বামপন্থীদের সংঘর্ষের মোকাবেলায় আমাকে নামতে হবে। তাই জ্বর নিয়ে একটি আলোয়ান গায়ে দিয়ে হাজির হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। তখনো সমাবেশ শুরু হবার অনেক দেরি। মনে হলো ‘দু’পক্ষের কাছে আমিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
আমতলায় পৌঁছে ছাত্রলীগের কোনো বড় নেতার সাক্ষাৎ পেলাম না। দেখা হলো সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি সামসুল হক, ফজলুল হক হলের ভিপি আব্দুল মতিন ও ইকবাল হলের ভিপি দেওয়ান সফিউল আলমের সঙ্গে। দেওয়ান সফিউল কুমিল্লা কলেজে পড়বার সময় আমাদের দল আরএসপি’র সংস্পর্শে এসেছিল। এদের সকলের সঙ্গে কথা বললাম। স্থির হলো কোনো উস্কানিমূলক বক্তব্য নয়। কাশ্মীরের দাবিতে যাদের যা খুশি বলতে পারে।
ঘণ্টাখানেক পর সমাবেশ শুরু হলো। লক্ষ করলাম মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের অনেকে ছাত্র সমাবেশে এসেছে। মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগ বরাবর দুর্বল। সভার শুরুতে বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন সামসুল হক। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি কারো নাম উল্লেখ না করে বললেন, পাকিস্তানে কোনো মীর জাফরকে সহ্য করা হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র কালিদাস বৈদ্য স্লোগান দিলেন–মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ। প্রতিপক্ষ স্লোগান দিলো–শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ–হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। সেকালে মারামারিতে বোমা-রাইফেল, পিস্তল ছিল না। তাই সংঘর্ষ হাতাহাতিতে সীমাবদ্ধ থাকল। দীর্ঘক্ষণ সংঘর্ষ চলার পর দোতলা থেকে অর্থনীতি বিভাগের ড. নূরুল হুদা ও ইংরেজির টার্নার নিচে নেমে এলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে সবাই শান্ত হয়ে গেল।
সে সময়ের একটি ঘটনা আজও মনে পড়ছে। ছাত্রলীগের সদস্যরা ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের ভারতীয় দালাল মনে করত। তাই ওই দিন ছাত্রলীগের এক সদস্য ছাত্র ইউনিয়নের এক সদস্যকে কান ধরে বলতে বাধ্য করছিল–কাশ্মীর পাকিস্তানে চাই। দৃশ্যত সংঘর্ষে ছাত্রলীগ জিতেছিল। বিকেলের দিকে আমতলায় দাঁড়িয়ে ছিল বাংলার ছাত্র সুনীল মুখোপাধ্যায় (পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)। আমি তখন ক্লান্ত। আলোয়ান ছিঁড়ে গেছে সংঘর্ষ ঠেকাতে। সুনীল বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম–এরপর কী হবে বলুন? তিনি হেসে বললেন, আমতলায় কোনোদিন সিরাজদ্দৌলা জিততে পারে না। এরপর ছাত্রলীগে ফেরার কথা আর ভাবতে পারছিলাম না।
এরপর আর এক বিপদ এগিয়ে এল আমার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন আওয়ামী কংগ্রেসে কোয়ালিশন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান এবং অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিদ্ধান্ত নতুন গোলযোগের সূত্রপাত করে।
