সুয়েজ সংঘর্ষ শুরু হলো ২৯ অক্টোবর। কলম্বো শক্তিসমূহ ১২ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে বৈঠক আহ্বান করল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজি হলেন না এই বৈঠকে যেতে। পরিবর্তে তিনি প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জাকে নিয়ে তেহরান চলে গেলেন বাগদাদ চুক্তির বৈঠকে যোগ দিতে। বাগদাদ চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কমিউনিস্ট বিরোধী সামরিক জোট।
মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের বাগদাদ চুক্তির তীব্র বিরোধী ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হলো মিসর। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিসর সফরে যেতে চাইলে নাসের প্রত্যাখ্যান করল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে সুয়েজে যুদ্ধ বিরতি হলো। সিদ্ধান্ত হলো সুয়েজে খবরদারি করবে জাতিসংঘ বাহিনী। পাকিস্তান এ বাহিনীতে সৈন্য দিতে চাইলে মিসর আপত্তি জানায়। অর্থাৎ সুয়েজ সঙ্কট শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন জানায়নি মিসরের প্রশ্নে। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান ও মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়েছিলেন–মিসরের পক্ষে। পূর্ব পাকিস্তানে মিসর দিবস পালিত হয়েছিল। এ দিবস পালনে আওয়ামী লীগ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান একমত না হলেও বিরোধিতা করেননি।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন হলেও এ সংগঠনের মূল শক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্ব পাকিস্তানে ছিল একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য। আবার বিভিন্ন বামপন্থী দল প্রকাশ্যে কাজ করতে না পেরে আওয়ামী লীগের আশ্রয় নিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ছিল সকল ধরনের যুদ্ধচুক্তি বিরোধী এবং প্রতিবাদ জানিয়েছিল পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, বাগদাদ চুক্তি এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির। অথচ আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাশ্চাত্য ঘেঁষা এবং এই চুক্তির সমর্থক। ফলে সঙ্কট অনিবার্য হয়ে উঠল।
আমি এ সফরে বিপদে পড়লাম ভিন্ন দিক থেকে। দীর্ঘদিন পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৫৪ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান পদত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন তাঁরা এ পদে আছেন। এ নিয়ে বিক্ষোভ আছে ছাত্রদের মধ্যে। তাই সিদ্ধান্ত হলো ১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে সম্মেলন হবে। সম্মেলনের নাম উঠতেই প্রশ্ন উঠল, পরবর্তী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রস্তাব এল মোমিন তালুকদার সভাপতি থাকবেন না। সভাপতি হবেন এম এ আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক হবে নির্মল সেন। অনেক আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।
কিন্তু সম্মেলনের পূর্ব মুহূর্তে সবকিছু পাল্টে গেল। প্রস্তাব এল, এবার পূর্বের কমিটি বহাল থাকবে। শুধু নির্মল সেন দফতর সম্পাদক থেকে সহ সভাপতি হবে। সভাপতি মোমিন তালুকদার মাত্র ক’মাস পরে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাঁর আসন শূন্য হলে নির্মল সেন সভাপতি হবেন।
আমি এ জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। জানতামও নাম। সম্মেলনে এ প্রস্তাব উঠলে আমি বিরোধিতা করলাম। প্রতিবাদে নয়টি জেলার প্রতিনিধিরা সম্মেলন ত্যাগ করল। তাদের সন্তুষ্ট করার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে একটি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নিখিল পাকিস্তান কো-অর্ডিনেটিং কমিটি গঠন করা হলো। আমাকে তার সদস্য করা হলো। আমি চলে এলাম। প্রকৃতপক্ষে সেদিন আমার সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পর্ক ছিন্ন হলো। আর আমার পক্ষে ছাত্রলীগে থাকাও সম্ভব ছিল না। কারণ শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হবার পর আমাদের দল অর্থাৎ আরএসপি’র বৈঠক বসেছিল কুমিল্লায়। কুমিল্লা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল–আমাকে ছাত্রলীগ ছাড়তে হবে। ছাত্রলীগ অন্ধভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি সমর্থন করছে। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় হয়ে গেছে। সময় সুযোগ বুঝে ছাত্রলীগ ছাড়তে হবে। আমি ছাত্রলীগ থেকে চলে এলাম। তবে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দিলাম না। তাই মাঝে মাঝে ছাত্রলীগ নেতারা আমার কাছে আসতেন আলোচনার জন্যে। আমি জানতাম আমি চলে আসায় ছাত্রলীগকে বিপদে পড়তে হবে। অসম্মানজনকভাবে এম এ আউয়ালকে চলে যেতে হবে ছাত্রলীগ থেকে। কারণ সব হিসাব, সংগঠনের যোগাযোগ আমার সঙ্গে। আমি না থাকলে সে থাকতে পারবে না। নতুন ছেলেরা সব হিসাব চাইবে। তাই আউয়াল প্রায়ই আসত আলোচনার জন্যে। এখানে বলা প্রয়োজন, আমি যখন ছাত্রলীগে যোগ দিই তখন সারাদেশে ছাত্রলীগের মাত্র তিনটি জেলায় সক্রিয় কমিটি ছিল। আমি চলে আসার আগে দেশের ১৭ জেলায়ই সক্রিয় কমিটি গঠিত হয়।
কিন্তু ছাত্রলীগে আমার আর ফেরা হলো না। ইতোমধ্যে একদিন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এলেন। তিনি সলিমুল্লাহ হল প্রাঙ্গণে ভাষণ দিলেন তাঁর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। এ ভাষণে তিনি উল্লেখ করলেন তাঁর বিখ্যাত জিরো– শূন্য তত্ত্ব। তিনি বললেন, পাকিস্তানের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো কতগুলো গণিতের শূন্য-এর মতো। এর বাঁ দিকে যে কোনো অংক বসালেই তার অর্থ হয়। যেমন একটি শূন্যের বাঁয়ে এক বসলে ১০ হয়। অন্যথায় শূন্য হয়ে যায়। এই এক অংকটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যতীত আমরা শূন্য থেকে যাবে এবং এই অংকেই তিনি বাগদাদ চুক্তি, পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি এবং সিটো চুক্তির সমর্থক। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এ ভাষণে পাণ্ডিত্য থাকলেও গ্রহণযোগ্য হলো না সাধারণ ছাত্র সমাজের কাছে। ওই সভায় আমি যাইনি। শুধুমাত্র আমাকে ঢাকা হলে বসে অনেক কথা শুনতে হলো। সকলেই জিজ্ঞাসা করতে শুরু করল–আর কতদিন ছাত্রলীগে থাকবেন?
