মওলানা সাহেবের ভাষণের পর লঞ্চ ছেড়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মওলানা সাহেব, এ তথ্য আপনি কোথা থেকে পেলেন? এ তথ্য সঠিক নয়। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬০ সাল। মাত্র ৪ বছর। এ ৪ বছরের মধ্যে দুনিয়া থেকে সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এ তথ্যটি আপনি বেভানের কাছ থেকে পেয়েছেন। বেভান ব্রিটিশ শ্রমিক দলের বামপন্থী অংশের নেতা। শুনেছিলাম মওলানা সাহেব লন্ডনে থাকাকালীন বেভানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। বেভানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে পাকিস্তানের জন্ম এবং কাশ্মীর নিয়ে। আমার ধারণা হয়েছিল মওলানা সাহেব হয়তো তার কাছে এমন একটা কিছু শুনেছেন।
মওলানা সাহেব আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। এমনিতেই তিনি আমার আচরণে খুশি নন। আমি তাঁকে হুজুর বলে সম্বোধন করি না। এটি তিনি লক্ষ করেছেন।
তবে মওলানা সাহেবের জবাবের জন্যে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো না। লঞ্চ আর একটি স্টেশনে পৌঁছাল। সেই স্টেশনেও মওলানা সাহেবকে ভাষণ দিতে হলো। শ্রোতা অধিকাংশ মুসল্লি। মওলানা সাহেব এবার আর সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি উল্লেখ করলেন না। তিনি কোরান থেকে দুটি সুরার উদ্ধৃতি দিলেন। খলিফা হারুন-অর রশিদের শাসন আমলের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, ইসলামের বিধান হচ্ছে দুনিয়ার সকল মানুষ দুনিয়ার সকল সম্পদের অংশীদার। ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলাম হচ্ছে অসাম্যের বিরুদ্ধে জেহাদ।
এমনি করে ভোলার বিভিন্ন জনসভায় তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। উপস্থিত জনসভায় তিনি ভাষণ দিলেন। উপস্থিত জনতার মনমেজাজ পরিচ্ছদ লক্ষ রেখেই তাঁকে বক্তৃতা করতে দেখলাম। কোথাও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের কথা বললেন। কোথাও বললেন ইসলামের সাম্যের কথা। আরো লক্ষ করলাম, সব সভায় তিনি একক বক্তা হতে চান। তারপরে কেউ বক্তৃতা দিতে পারে না। তার দীর্ঘ ভাষণের পর তিনি জিজ্ঞেস করেন–আদৌ কোনো বক্তা আছে কিনা। নিজে নিজেই বলেন, আর কোনো বক্তা নেই। কাজেই প্রস্তাব পাঠ শুরু করেন। চোখের সামনে কোনো কাগজ ছাড়াই তিনি স্কুল, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, সড়ক-সেতুগুলো দাবি করেন এবং এক সময় বলেন, এখানেই শেষ।
আমার জীবনে এ ধরনের সমাবেশের অভিজ্ঞতা আদৌ ছিল না। কখনো লক্ষ করিনি নেতাদের এ ধরনের বৈশ্যতা। কেউ যেন মওলানা সাহেবের সামনে কথা বলতে পারে না। তিনি হঠাৎ সবাইকে ধমক দেন। কারো যুক্তি বেশিক্ষণ শুনতে চান না। নিজেই শুরু এবং শেষ করেন। তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে গেলে হতে হয় নির্বাক শ্রোতা। প্রতিবাদ করা যেত না। আমার সঙ্গে এমন ঘটনাই ঘটেছিল।
আমরা উপনির্বাচনের সফরে বেরিয়েছিলাম। কথা ছিল ভোলা ও পিরোজপুর দু’টি এলাকাতেই জনসভায় ভাষণ দেয়া হবে। কিন্তু ভোলা সফর শেষে তিনি বললেন, তিনি এখন ঢাকায় ফিরবেন। কাগমারী যাবেন। আমি বললাম, তা হবে না। তিনি বললেন, বেশি বাড়াবাড়ি করো না। বরিশালে খবর দিয়ে দাও, ওরা যেনো স্টিমারে টিকেট কেনে। আমি আগামীকালই স্টিমারে ঢাকা যাব।
উপায় নেই। আমরা বিশেষ লঞ্চে বরিশাল ফিরলাম। পিরোজপুরে আর জনসভা হলো না। স্টিমারের প্রথম শ্রেণিতে আমাদের আশ্রয় হলো। তখন বরিশাল থেকে স্টিমার নারায়ণগঞ্জ আসত। ঢাকা পর্যন্ত আসত না।
স্টিমার নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা হেলে পড়ে পশ্চিমে। মওলানা সাহেব দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন। বললাম, নাস্তার কথা। তিনি প্রথম রাজি হলেন না। বেশ কিছু পরে বললেন, নাস্তার অর্ডার দাও। নাস্তা এলো। প্রথম শ্রেণির দামি নাস্তা দেখে তিনি বলেন, এ নাস্তার অনেক দাম। পয়সা সৃষ্ট করা যাবে না। আর আপনি এ নাস্তাই আনতে বলেছেন। তিনি কিছুটা খেলেন। বাকিটা কর্মচারীদের দিয়ে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে বললেন, আমি চাষাড়ায় ওসমান আলীর বাড়িতে থাকব। তুমি ঢাকা যাও। মুজিব আর মাহমুদ আলীকে খবর দাও আমার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে দেখা করতে। মাহমুদ আলী তখন গণতন্ত্রী দলের নেতা। গণতন্ত্রী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। কোয়ালিশন সরকারে আছে। আমার মনে হলো, মওলানা সাহেব উপনির্বাচন নিয়ে দুজনের সঙ্গেই আলোচনা করতে চান।
আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা ফিরলাম। সকলকে খবর দিলাম। পরদিন ভোরে ইত্তেফাকে দেখলাম, অসুস্থ মওলানা ভাসানীর কাগমারী গমন। আর আমি ঢাকায় পৌঁছে আর এক সঙ্কটের মুখোমুখি হলাম। শুনলাম মিসরের বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স হামলা চালিয়েছে। প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র জনতা পুরানা পল্টনের মোড়ে ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের ভবন পুড়িয়ে দেয়।
ইংরেজ ও ফরাসি মিসর হামলার কারণ ছিল সুয়েজ খাল। একশ’ তিন মাইল দীর্ঘ সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে আরব সাগরকে যুক্ত করেছে। এ খাল কাটা না হলে নৌপথে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় আসতে হতো উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে। প্রয়োজন হতো মাসের পর মাস। সুয়েজ খাল খননের ফলে পাশ্চাত্যের উপনিবেশ শক্তিবর্গের প্রাচ্যে শাসন ও শোষণের পথ আরো সহজ হয়। খালটি খনন করে ফরাসি নাগরিক ফার্ডিন্যান্স দ্য লেসেপস ১৮৫৯-১৮৬৯ সালে। এক সময় ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার মিসরের কাছ থেকে এক কোম্পানির শেয়ার কিনে কোম্পানির মালিক হয়। মিসরের নাসের ক্ষমতায় আসার পর নীল নদের ওপর বাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা করে। এ বাঁধ আসোয়ান বাঁধ নামে পরিচিত। এ বাঁধে পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ অর্থ সাহায্য দিতে রাজি না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট নাসের ১৯৫৬ সালের জুন মাসে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এ জাতীয়করণের তিন মাস পর ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ৩০ অক্টোবরে মিসরে হামলা চালায়। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধমকে ইঙ্গ-ফ্রান্স সরকারকে নতিস্বীকার করতে হয়। ঢাকাতে ভস্মীভূত হয় ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের ভবন। নতুন সঙ্কট দেখা দেয় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে। প্রশ্ন ওঠে পাশ্চাত্য ঘেঁষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোন দিকে যাবেন?
