আমি প্রধানমন্ত্রীকে পাস কাটিয়ে গেলাম। পরিষদ ভবনে মওলানা ভাসানীকে পেলাম না। শেখ সাহেবকে বললাম। তিনি মিছিল নিয়ে আমার সঙ্গে এলেন। সেদিন দেখেছিলাম মিছিল নিয়ন্ত্রণের অটুট ক্ষমতা। তিনি আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের উত্তরের রাজপথে এসে জনতাকে ধমক দিলেন। বললেন, তোমাদের পরিষদ সদস্যদের আক্রমণ করতে কে বলেছে? কে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাড়িতে ঢিল মারতে? জনতা টু শব্দটি না করে আস্তে আস্তে সরে গেল। আর ইতোমধ্যে ড. মযহারুল হকের বাসা থেকে আমার কাছে একটি স্লিপ এলো৷ পি লিখেছেন হাশেম উদ্দীন আহমদ। তিনি লিখেছেন, তার কাপড়ের অবস্থা বেহাল। বাড়ি থেকে নতুন কাপড় না এলে পরিষদে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমি স্লিপটি শেখ সাহেবের হাতে দিলাম। তিনি হেসে শ্লিপটি হাতে নিলেন। আমি জানতাম, এ মানুষটিই এ কাজটি করতে পারবেন এবং করবেন।
হরতালের পরে রাতে শুনলাম গভর্নর এ কে ফজলুল হক আবু হোসেন সরকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে বলেছেন। মনে হলো আমার ছাত্রলীগ ছাড়বার পালা এল। কারণ প্রদেশে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা। ছাত্রলীগের পক্ষে এই মন্ত্রিসভার বিরোধিতা করা সহজ হবে না। আর আমার পক্ষে আওয়ামী লীগকে অন্ধ সমর্থন দেওয়া সম্ভব হবে না।
সেই সময়টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখন আত্মীয়স্বজন কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না। ১৯৫৪ সালের পর আমার আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। চিঠিপত্রও বন্ধ। আমার সঙ্গে কারো খবর রাখাও বিপজ্জনক। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি যে কত বিপজ্জনক তা তখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তখন আমার সঙ্গে মতানৈক্য দেখা দিচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১২ সেপ্টেম্বর চৌধুরী মোহাম্মদ আলী পদত্যাগ করেন। ৮০ জনের পার্লামেন্টে মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময় তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ৮ সেপ্টেম্বরে রাজবন্দি মুক্তি।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ওয়াদা ছিল। ওই ওয়াদায় বলা হয়েছিল জননিরাপত্তা আইন বাতিল করা হবে এবং রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সকল সদস্য নিয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। ৫৯ জন রাজবন্দিকে মুক্তি দেন। ইতিহাসে এ ছিল একটি অনন্য ঘটনা। পৃথিবীর কোনো সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে জননিরাপত্তা আইন বাতিল হয়নি। এভাবে মুক্ত হয়নি কোনো দেশের রাজবন্দিরা। কেন্দ্রে তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হননি।
প্রশ্ন উঠেছিল জননিরাপত্তা আইন না থাকলে দেশ চলবে কী করে? তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট বিরোধী সরকার। সুতরাং পাকিস্তানে কমিউনিস্টদের আটক করার জন্যে একটি আইন প্রয়োগ করা হবেই। পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানেরই অঙ্গ। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকার নতুন করে জননিরাপত্তা আইন জারি করলে পূর্ব পাকিস্তানেও তা প্রযোজ্য হবে। তবে জননিরাপত্তা আইন না থাকলে কী অবস্থার সৃষ্টি হয় পরবর্তীকালে সে নজির পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সরকারই দেখিয়েছে। এই আওয়ামী লীগ সরকারই শেষ পর্যন্ত ৭ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করেছিল চোরাচালানীর অভিযোগে। আওয়ামী লীগের এ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো তখন সহজ ছিল না। ইত্তেফাকের পাতায় পাতায় তখন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ঝড় বইত। ইত্তেফাকের মালিক সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তখন ইচ্ছামতো কমিউনিস্টদের গালি দিতেন।
এ সময় একটি ভিন্ন কারণে আমি মওলানা ভাসানীর কাছাকাছি আসি। একদিন সন্ধ্যা রাতে হলে ফিরে দেখি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা আমার জন্যে আমার পাশের কক্ষে অপেক্ষা করছেন। আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম। তাঁরা বললেন, বিশেষ কারণে তারা আমার কাছে এসেছেন। কারণটি হচ্ছে মওলানা সাহেবের প্রথম পুত্র আবু নাসের খান ভাসানী অর্থাৎ বাবুকে পড়াতে হবে। বাবু প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী। ছাত্র তেমন ভালো নয়। আমার উপায় ছিল না তাদের ফিরিয়ে দেবার। তবে বলেছিলাম আমি কিন্তু বিনা বেতনে পড়াব না এবং টাকা নিয়েই বাবুকে পড়াতাম। বাবু আমার কাছে এসেই পড়ত। বাবু দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।
তখনও আমি ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক। তখন পিরোজপুর ও ভোলায় দুটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী এ দুটি জেলায় সফর করবেন। আমি এককালে বরিশালের ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আমাকে তার সফরসঙ্গী হতে হলো। এই সফরে গিয়ে আমি মওলানা ভাসানীর একটি বিশিষ্ট রূপের সন্ধান পেলাম। তার সঙ্গে আমার শুরু হলো বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক। আমরা একটি বিশেষ লঞ্চে করে বরিশাল যাত্রা করেছিলাম। যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্টেশনে লঞ্চটি থামতো। মওলানা সাহেব সব স্টেশনেই ভাষণ দিতেন। তার প্রথম স্টেশনের ভাষণকে কেন্দ্র করেই আমার সঙ্গে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। তিনি তাঁর ভাষণে বললেন-”দুনিয়ার সকল সম্পদ শতকরা পাঁচ জনের হাতে জমা হইয়াছে। দুনিয়ায় শতকরা ৯৫ ভাগ মজলুম। ১৯৬০ সালের মধ্যে তামাম দুনিয়া হইতে সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে। দেশে দেশে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হইবে।…’
