পূর্ব পাকিস্তানে তখন প্রধানমন্ত্রী কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার। প্রদেশের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কেন্দ্রে মুসলিম লীগ ও কেএসপি। পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগ অথচ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নেই। আবু হোসেন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিদিনই সভা মিছিল হরতাল হতে শুরু করল। অপরদিকে কোন্দল দেখা দিল কেএসপির কোয়ালিশন সরকারে। আওয়ামী লীগেও বিরোধ দেখা দিল বৈদেশিক নীতি নিয়ে। পাকিস্তানের সংবিধানে অর্থবছর পরিবর্তন করা হলো। নতুন অর্থবছর হলো জুলাই থেকে জুন। অথচ আবু হোসেন সরকার ভয় পাচ্ছিল প্রাদেশিক পরিষদ ডাকতে। বাজেট পাস করতে। কারণ ভয় ছিল পরাজয়ের। অপরদিকে আওয়ামী লীগ দাবি জানাচিছল প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকতে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার আবু হোসেন সরকারকে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার নির্দেশ দেয়। পরিবর্তে আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করেন ৩০ আগস্ট।
আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করায় দেশে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানে তখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিছিল হচ্ছে চালের দাবিতে। ৪ সেপ্টেম্বর এমন একটি মিছিল জিঞ্জিরা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে চকবাজার হয়ে নতুন ঢাকার দিকে আসছিল। পুলিশ এই মিছিলে গুলি করে। চার জন নিহত হয়। আওয়ামী লীগসহ সকল ছাত্র প্রতিষ্ঠান সারাদেশে এই হত্যার প্রতিবাদে হরতাল আহ্বান করে ৫ সেপ্টেম্বর।
৫ সেপ্টেম্বর আমার হরতালের দায়িত্ব পড়ে হাইকোর্ট এলাকায়। আমার সঙ্গে ছিলেন ফজলুল হক হলের ছাত্র আবদুর রহিম। যিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন।
আমাদের এলাকা ছিল হাইকোর্ট মোড় থেকে মেডিক্যাল কলেজের মোড় পর্যন্ত। সেদিন এই এলাকায় কতগুলো দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। ওইদিন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ছিল। আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করলেও গভর্নর ফজলুল হক তখনো কাউকে নতুন সরকার গঠন করতে বলেননি। তাই সেদিন পরিষদ অধিবেশন থাকায় অসংখ্য সদস্যকে তকালীন পরিষদ ভবন (জগন্নাথ হল) মিলনায়তনে যেতে হচ্ছিল আমাদের এলাকা হয়ে এবং প্রতিটি গাড়ি নিয়েই বিবাদ হচ্ছিল।
এক সময় দেখা গেল, সামরিক বাহিনীর পাহারায় কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস আসছেন। স্বাভাবিকভাবেই জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠল। লতিফ বিশ্বাস কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী। আর ঢাকায় গুলি হয়েছে ভুখা মিছিলের ওপর। তাই জনতার বিক্ষুব্ধ হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। এ পরিস্থিতিতে আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের গাড়িবহর হাইকোর্টের কাছে এলে আমরা তাঁকে গাড়ি ছেড়ে দিতে বললাম। বললাম, আপনাকে পৌঁছে দেব পরিষদ ভবনে। তিনি আমাদের কথায় রাজি হলেন। হেঁটে চললেন আমাদের সঙ্গে।
কিন্তু আমরা রমনা গেটের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মিছিল হিংস্র হয়ে উঠল। মিছিল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। ভাবলাম পরিষদ ভবন নয়, লতিফ বিশ্বাসকে বাঁচাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীনিবাসে পৌঁছে দেব। কারণ তাঁকে নিরাপদে পরিষদ ভবন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছিলো না। ইতোমধ্যে কে যেন তার মুখে গোবর মাখিয়ে দিল।
রমনা গেটের উত্তরে মিছিলে গোলযোগ শুরু হলো। বাংলা একাডেমীতে মিছিল পৌঁছাতে পারল না। সিদ্ধান্ত নিলাম যে কোনো ভবনে তাঁকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। বাংলা একাডেমীর দক্ষিণ পাশে আজকের পুষ্টি ভবনে তাঁকে ঢুকিয়ে দিলাম। কিন্তু জনতা তখন মারমুখি। আর সঙ্গী তখনকার ছাত্রলীগের সদস্য আজকের জাতীয় পার্টি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁকে বললাম, মোয়াজ্জেম একটা বক্তৃতা দিয়ে মিছিল ফিরিয়ে নাও।
সেদিন মোয়াজ্জেমের বক্তৃতা আজো আমার মনে আছে। মোয়াজ্জেম হোসেন বলল, ভাইসব মানুষ দেখে কারা পালায়?-কুকুর। আপনারা কি কুকুরের পিছু ছুটবেন? না, মিছিলে যাবেন আমাদের সঙ্গে?
মিছিল চলে এল আমাদের সঙ্গে। তখনো জানতাম না যে, এর চেয়েও বড়ো সমস্যা অপেক্ষা করছে রমনা গেটে। আবদুস সালাম খান এবং হাশেমুদ্দীন সাহেব তখন গাড়িতে যাচ্ছিলেন পরিষদ ভবনের দিকে। এ দু’জন এক সময় আওয়ামী লীগ করতেন। এরা আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভায় গিয়েছিলেন দল ছেড়ে। তাই এদের বিরুদ্ধে জনতার স্বাভাবিক আক্রোশ ছিল। রমনা গেটের মোড়ে এদের গাড়ি এলে আমি গাড়ি থামালাম। বললাম, নামুন। পৌঁছে দিচ্ছি পরিষদ ভবনে। গাড়িতে যেতে পারবেন না। তারা গাড়ি থেকে নামতেই মিছিল থেকে এক লোক গিয়ে তাদের মুখে গোবর মাখিয়ে দিল। কোনো মতে তাঁদের নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের দিকে এগোলাম। কিছুটা পশ্চিমে গিয়ে তুলে দিলাম ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ড. মযহারুল হকের বাসায়। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম ভিড় বাড়ছে। জনতা ক্ষিপ্ত হচ্ছে। ফজলুল হক হলের প্রভোস্টের বাসা বাঁচানো দায়। আমি একটি রিকশা নিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে গেলাম। ভাবলাম মাওলানা সাহেব বা শেখ সাহেবকে ছাড়া এ জনতা ঠেকানো যাবে না। তাদের একজন প্রয়োজন। নইলে অঘটন ঘটে যেতে পারে।
৩. পরিষদ ভবনে পৌঁছে তোপের মুখে
পরিষদ ভবনে পৌঁছে তোপের মুখে পড়লাম যেন। সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার। পাশে কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, পরিষদে আপনার বিরুদ্ধে মোসন আনব। আপনি আমাদের সদস্যদের পরিষদ ভবনে আসতে বাধা দিচ্ছেন। আমি শুধু লতিফ বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে–আমি না থাকলে আজ লোকটি রাজপথে নির্ঘাত মারা পড়ত।
