যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো সুপারিশ কাজে আসেনি। পাকিস্তানের সংবিধানে একটি অদ্ভুত ধারা সংযোজিত হয়েছিল নির্বাচন সম্পর্কে। রাতভর বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্যে যুক্ত নির্বাচন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্যে স্বতন্ত্র নির্বাচন। সেই সংবিধানের পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ আর পশ্চিম পাকিস্তান এখন পাকিস্তান। বাংলাদেশে এখন চালু আছে যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি। আর পাকিস্তানে এখনও চালু আছে স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি।
১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের সংবিধান রচনা শুরু হলো। এবার সে সংবিধানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতা হলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সংবিধান সম্পর্কে বিতর্কে শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর ইতিহাস বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন। সে যেনো আর এক সোহরাওয়ার্দী। যে সংবিধানের কাঠামো তিনিই প্রণয়ন করেছিলেন পূর্ববর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে, সেই সংবিধানের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ালেন হিমালয়ের মতো। কিন্তু কাজে এল না।
পূর্ব বাংলায় তখন প্রতিদিন মিটিং এবং মিছিল। আমি তখন আজকের শহীদুল্লাহ হল তৎকালীন ঢাকা হলে থাকি। হরতালে আমার দায়িত্ব পড়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ভবন এবং চানখারপুল এলাকায়। হরতাল থাক বা না থাক প্রতিদিন হরতালের জন্যে টোকাইরা আমার রুমের সামনে ভোরবেলা ভিড় জমাত। আমি তখন ঢাকা হলের তিনতলার পশ্চিম দিকের একটি কক্ষে থাকতাম।
এ কক্ষটিতে থাকার একটা শর্ত ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ কক্ষে তালা লাগানো যাবে না। অর্থাৎ নকল তালা থাকবে। এ কক্ষে জানালার কপাট খুলে ঘুমাতে হবে। কোনো কিছু বন্ধ রাখা যাবে না। এ সিদ্ধান্তের একটা ভিন্ন প্রেক্ষিত ছিল। প্রেক্ষিত হচ্ছে তঙ্কালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. এস এন মিত্রকে কেন্দ্র করে। ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে গেলে তিনি তাদের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করতেন, কোন হলের ছাত্র? হলের নাম শুনে ওষুধ লিখতে শুরু করতেন। খুব বেশি হলে জিজ্ঞেস করতেন ঘুমাবার সময় দরোজা জানালা খোলা থাকে কিনা। যারা দরোজা জানালা খোলা রেখে ঘুমাত তাদের তিনি ভালো করে দেখতেন। অন্যথায় কথাই বলতেন না। তাই আমি ডা, মিত্রর কাছে গেলে প্রতিদিনই ঝগড়া হতো এবং এ পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমাদের রুমে থাকতে হলে দরোজা-জানালা খুলে ঘুমাতে হবে। এভাবে ঘুমাতে অনেকেই রাজি হতো না। অনেকে অসুস্থ হয়ে যেত। আমাদের কক্ষ থেকে অন্যত্র চলে যেত। ওই কক্ষে আমরা যারা দীর্ঘদিন টিকেছিলাম তার মধ্যে ছিলেন জহিরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন, মনমোহন রায় এবং হিমাংশুরঞ্জন দত্ত। পরের তিনজনের কেউ কেউ পরবর্তীকালে চাকরিতে যুগ্মসচিব এবং অতিরিক্ত সচিব স্তরে পৌঁছেছিলেন।
আমাদের এ কক্ষের সামনে প্রতি ভোরে টোকাই জমতো। হরতাল না থাকলে তারা বিরক্ত হতো। হরতালের দিন আমাদের সঙ্গে নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেত। তবে তারা আমাকে বিশেষ পছন্দ করতো না। কারণ আমি ঢিল মারতে দিতাম না। গাড়িতে আগুন দিতে দিতাম না। এমনকি রিকশার দমও ছেড়ে দিতে দিতাম না। হরতালের দিন গাড়ি দেখলে টোকাইদের খুব আনন্দ হতো। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ইট নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যেতো। আমাকে কিছুতেই সামনে যেতে দিতো না। এমনকি একটি হরতালের দিনে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো হলের সামনে একটি গাড়ি দেখা দিল। টোকাইরা তখন গাড়ির আরোহীকে নামিয়ে ফেলেছে। সামনে এগিয়ে চিনলাম গাড়ির আরোহী ঢাকার ডিসি হায়দার সাহেব। হায়দার সাহেব অবাঙালি। আমি তাকে বললাম, আপনি একটু সামনে হেঁটে এগিয়ে যান। গাড়িটি আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তবে এমনি করে আজকে আপনার বের হওয়া ঠিক হয়নি। টোকাইরা বিক্ষুব্ধ হলো। তারা গাড়ি ছাড়তে কিছুতেই রাজি নয়। অনেক অনুনয় বিনয় করে গাড়ি ছাড়াতে হলো।
এ হরতাল নিয়ে আর একটি ভিন্ন ঘটনা ঘটল পরবর্তীকালে। সেদিন আমি টোকাইদের নিয়ে পুরোনো বেতার ভবনের দিকে এগিয়েছি। এমন সময় ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের এক মানুষ আমার কাছে এগিয়ে এল। আমাকে বলল, চলুন হিন্দুদের দোকানগুলো পুড়িয়ে দেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? সে জবাব দিল, ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অথচ কারো বাড়ি আমি আগুন দেইনি বা লুটও করিনি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ৫ বছর আমাকে জেল খাটানো হয়েছে। মিথ্যা মামলায় যখন জেল খাটলাম তখন রায়ট করতে অসুবিধা কী? আমি বললাম, ঠিক আছে। পরে একদিন রায়ট করা যাবে। আজকে রায়টের হরতাল নয়। আজকে আমাদের দাবিদাওয়া আদায়ের হরতাল। পরে একদিন সবাই মিলে রায়ট করা যাবে। সে মানুষটি আমার কথা শুনল। আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকল। সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল করল আমার সঙ্গে।
এ হরতাল আর বিক্ষোভের মধ্যে একদিন পাকিস্তান সংবিধান প্রণয়ন করা হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভালো বক্তৃতা করলেন ঠিকই কিন্তু দাবি আদায় হলো না। প্রকৃতপক্ষে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো দাবি আদায় করা গেল না। প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করলেন, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ওই সংবিধান চালু করা হবে। উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরের মুসলিম লীগ অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস পালন করা হতো। কিন্তু সংবিধান নিয়ে একমত হওয়া গেল না। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সংসদ থেকে বেরিয়ে আসলেন। সংবিধানে স্বাক্ষর করলেন না। তারা ২৩ মার্চ প্রজাতন্ত্র দিবসও পালন করলেন না। এ নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতানৈক্য হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীকালে সংবিধানে সই করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। ১৯৫৬ সালে সংবিধান প্রণয়নের পর পূর্ববাংলার নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান।
