এ যুক্ত নির্বাচন নিয়ে কিছু কিছু ঘটনা এখনও আমার মনে আছে। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে সংবিধান প্রণয়ন শুরু হয়। সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে তমুল বিতর্কের সষ্টি হয় পূর্ব বাংলায়। বিশেষ করে এক ইউনিট ও সংখ্যা সাম্যের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় সভা সমাবেশ শুরু হয়। একের পর এক মিছিল হতে থাকে ঢাকায়। তখন আমি ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক। আমাদের দল বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আরএসপি) তখন নিষিদ্ধ। কমিউনিস্ট পার্টিও তখন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আমাদের তখন প্রকাশ্যে কাজ করার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রকাশ্যে কাজ করার অর্থ হচ্ছে-নির্যাতন এবং কারাবরণ। আমাদের অনেক বন্ধুদেরই মত ছিল প্রয়োজন হলে ঝুঁকি নিয়েই প্রকাশ্যে কাজ করতে হবে। তখন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আবু হোসেন সরকার। তাঁর আমলে রাজারবাগে পুলিশ ধর্মঘট হয়। এ ধর্মঘটের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। আমাদেরও আবার নতুন করে গা ঢাকার চেষ্টা করতে হয়। শুধু আমি থেকে গেলাম ছাত্রলীগ হিসেবে প্রকাশ্যে কাজ করার জন্যে। এ সময়ে সংবিধানে যুক্ত নির্বাচনের সংযোজনের দাবি উঠতে থাকে।
এ যুক্ত নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় বক্তা আমি এবং ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুল মোমিন তালুকদার। আমরা যুক্ত নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করাতে সমর্থ নই। তখন পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের অধিবেশনে চলছিল (বর্তমান জগন্নাথ হল মিলনায়তনে)। আমরা পরিষদ ভবনে গিয়ে আমাদের প্রস্তাব পেশ করি।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন বিচারপতি ইব্রাহিম। এ সময় একদিন আমি তাঁর বাসায় যাই। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল বরিশাল থেকে। বরিশালে তিনি দীর্ঘদিন বিচারপতি হিসেবে ছিলেন। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁর আদালতে প্রতিবারই আমরা সুবিচার পেয়েছি। তাই তাঁর সম্পর্কে একটি ভিন্ন ধারণা ছিল আমার ছাত্র জীবনের প্রারম্ভে। সেই বিচারপতি ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়, যুক্ত নির্বাচন প্রস্তাব পাস হবার পর। তিনি আমাকে বললেন-নির্মল, কাজটি তুই ঠিক করিসনি। আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিশ্বাস করি না। তুই নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবি বরিশালে আমি কোনোদিন মুকুল ফৌজের অনুষ্ঠানে যাইনি। আমি মুসলিম লীগের রাজনীতি পছন্দ করি না। আমি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বিশ্বাস করি না। তিনি যুক্ত নির্বাচনের প্রস্তাব এনেছেন তোদের অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করার জন্যে। স্বতন্ত্র নির্বাচন থাকলে সংখ্যালঘুরা রাজনীতির রদবদলের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবে। তারা যে দলকে সমর্থন করবে তারাই মন্ত্রিসভা গঠন করবে। যুক্ত নির্বাচন হলে সংখ্যালঘুরা তেমন নির্বাচিত হতে পারবে না। রাজনৈতিকভাবে তারা পরাজিত হয়ে যাবে। তোর এ প্রশ্নটি লক্ষ করা উচিত ছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোনো আদর্শের তাড়নায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি।
ঠিক একই কথা বলেছিলেন প্রয়াত রসরাজ মণ্ডল। তফশিল ফেডারেশনের নেতা রসরাজ মণ্ডল তখন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী। তার কাছে আমি ছাত্রলীগের আমতলার প্রস্তাবের অনুলিপি দিয়েছিলাম। তিনি প্রস্তাব হাতে নিয়ে বললেন, আপনি শেষ পর্যন্ত আমাদের সর্বনাশ করলেন। আপনাদের প্রস্তাবই হচ্ছে যুক্ত নির্বাচন সম্পর্কে ছাত্রদের প্রথম প্রস্তাব।
আমি সেদিন কোনো জবাব না দিয়ে চলে এসেছিলাম। কিন্তু আমার প্রিয় ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের কথার জবাব আমাকে দিতে হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, স্যার আপনার কথার জবাব আমি আজকে না। আপনার কথাই সত্য কিন্তু আমি একটি আদর্শে বিশ্বাস করে রাজনীতি করি। আমার আদর্শ সাম্প্রদায়িক গণ্ডি মানে না। আমি বিশ্বাস করি, যে কোনো জায়গা থেকেই হোক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে। স্যার, আপনি অনেক কিছু জানলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জ্বালা আপনার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এ জ্বালা অনুধাবন করতে পারে পূর্ব বাংলার হিন্দু, পশ্চিম পাঞ্জাবের হিন্দু ও শিখ এবং সারা ভারতের মুসলমান। কেউই ইচ্ছে করে পূর্ব পুরুষের ভিটা ছেড়ে চলে যায় না। যায় অনেক চোখের জলে। সে ঘটনাই ঘটছে এ উপমহাদেশে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্যে। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার ছিল স্বতন্ত্র রাজনীতি পদ্ধতি। সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে হলে এ পদ্ধতির ইতি টানতেই হবে। সেদিন বিচারপতি ইব্রাহিম আমার কথা শুনে হেসেছিলেন। বললেন–তোর মতো বয়সে আদর্শবোধ থাকাই স্বাভাবিক। ঠিক আছে, তুই যা করছিস ভালোই করেছিস। কিন্তু আমি তোর সঙ্গে একমত নই।
সেদিন নির্বিবাদে স্যারের ভবন থেকে বের হয়েছিলাম। বিপদে পড়লাম গভীর রাতে একটি পত্রিকা অফিসে। পত্রিকাটির নাম সাপ্তাহিক যুগবাণী। সম্পাদক বহু বিতর্কিত চিত্তরঞ্জন সুতার। তিনি তখন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। আমি তখন ঐ পত্রিকার বিনা পয়সার কলাম লেখক। আমি উপসম্পাদকীয় লিখি। আমি সে রাতে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম, কী করে যেনো তার কাছে খবর পৌঁছেছিল। তিনি গভীর রাতে পত্রিকা অফিসে পৌঁছালেন। বললেন, এমনি করে ঢালাওভাবে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে লেখা যাবে না। আমি বললাম, তাহলে আমি লিখব না। আজ থেকেই আপনার পত্রিকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ। সেদিন দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের মধ্যে আলাপ হলো। তারপর আমি নতুন করে উপসম্পাদকীয় লিখলাম। আমার লেখায় নতুন করে একটু ঘুরিয়ে একটি বাক্যবিন্যাস করলাম। আমাকে লিখতে হলো–আমরা যুক্ত নির্বাচন চাই। তবে অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্যে কিছুদিনের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা বাঞ্ছনীয়।
