তবে পূর্ববাংলার চিত্র ছিল একান্তই ভিন্ন। পাকিস্তান সৃষ্টির সময় পূর্ববাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সীমিত সংখ্যক জোতদার-জমিদার থাকলেও অধিকাংশ নেতা ছিলেন উকিল ও মোক্তার। মুসলিম লীগের মূল শক্তি ছিল ছাত্র সংগঠন। এ ছাত্র সংগঠনের তরুণরা অনেক সময়ই নেতাদের পাত্তা দিত না। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল হিন্দুদের প্রতিযোগিতামুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি পাবার একটি স্বপ্নের আবাস। তারা পাকিস্তানকে দেখেছে নিত্যদিনের জীবনের দেনাপাওনার হিসেবের ভিত্তিতে। তাই তারা প্রথম থেকেই ছিল অধিকার সচেতন। তাদের কাছে রাষ্ট্র ভাষার আন্দোলন প্রথমদিকে কোনো আবেগ বা ঐতিহ্যের আন্দোলন ছিল না। ছিল অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তাদের কাছে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুর কোনো পার্থক্য ছিল না। ইংরেজি তাদের পদে পদে পরাভূত করেছে হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। তাই তারা বিদেশি ভাষা উর্দু মেনে নিয়ে আর একবার পরাভূত হতে চায়নি।
এছাড়া পূর্ববাংলায় ছিল অবিভক্ত বাংলার বামপন্থী আন্দোলনের রেশ এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য। এ বাঙালি তরুণরাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ১৯৪৬ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। এ ঐতিহ্যের তারতম্যের জন্যেই পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক চিত্রের তারতম্য ছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, এ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বামপন্থী তরুণরাই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে একই মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল। পরাজিত করেছিল মুসলিম লীগকে। পূর্ববাংলা পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঘাঁটিতে। পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। পূর্ববাংলার রাজনীতিতে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাতা হিসেবেই আবির্ভূত হন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাসাম্য ও এক ইউনিট মেনে নেয়। আর পশ্চিমাদের এ সুযোগ দিয়ে বিনিময়ে ৮০ জনের পার্লামেন্টে মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হবার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে আদর্শের কোনো বালাই ছিল না।
একই প্রতিযোগিতায় নামেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক পার্টি নিয়ে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন পাকিস্তান মন্ত্রিসভায়। দুটি দলই সব আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছিল ব্যক্তিস্বার্থে। তখন সঠিক বুর্জোয়া আদর্শ ধারণ করেও কোনো রাজনৈতিক দল দেশে আত্মপ্রকাশ করেনি। ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছিল–দলটির মূল চরিত্র ছিল সুবিধাবাদী।
এই আওয়ামী লীগ ও কেএসপি তখন পূর্ববাংলার রাজনীতির নেতৃত্বে। দেনা-পাওনাই ছিল তাদের মূল চালিকা শক্তি। এই দেনাপাওনার জন্যেই দু’টি দল বারবার পূর্ববাংলার স্বার্থ বিক্রি করেছে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের কাছে।
অপরদিকে মুসলিম লীগ না থাকলেও তার ভাবাদর্শ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তখন সামরিক বেসামরিক আমলার নেতৃত্বে গড়ে উঠছিল একটি পুঁজিপতি শ্রেণি। রাজনীতির মঞ্চ থেকে একের পর এক বিদায় নিচ্ছিল রাজনীতিকরা। পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজির বিকাশ হচ্ছিল আমলাদের নেতৃত্বে। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসছিল আমলারা। এরা ছিল একান্তই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর। এরা তাই নিজস্ব প্রয়োজনে পূর্ববাংলায় নিজস্ব মিত্র খুঁজছিল এবং রাজনীতির দিক থেকে তাদের পছন্দ ছিল মার্কিন ঘেঁষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
৯২(ক) ধারা আমলে পাকিস্তান কমিউনিস্ট বিরোধী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থার (সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন) এবং বাগদাদ চুক্তি স্বাক্ষর করে। পূর্ববাংলার নেতাদের মধ্যে একমাত্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দুই কমিউনিস্ট বিরোধী জোটের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মূল রাজনৈতিক সংগঠন পূর্ববাংলার আওয়ামী মুসলিম লীগ এ চুক্তি সমর্থন করল না–তাই পশ্চিম পাকিস্তানের আমলা নেতৃত্বের সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কোনো সমঝোতাই স্থায়ী হচ্ছিল না। পার্লামেন্টে ১২ সদস্যের নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগতভাবে যতই পশ্চিম ঘেঁষা হোক না কেনো, রাজনীতির বাস্তব ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব তেমন ছিল না।
তবুও তকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানের উভয় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য শেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁকে রাজনীতি থেকে অপসারণ না করে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব ছিল না। তাই একবার শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ক্ষমতায় এনে ছুঁড়ে ফেলে দেবার ষড়যন্ত্রেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বারবার প্রধানমন্ত্রী হবার টোপ দেয়া হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগকে সে সত্যটি অনুধাবন করতে হয়েছে পরবর্তীকালে।
১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে এ প্রস্তাব গ্রহণও সহজ ছিল না। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘণ্টার পর ঘন্টা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যুক্তি দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়ালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পিছু হটতে হয়। ভোর ৪টায় এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৪৯ সালে জন্মের ৬ বছর পর ১৯৫৫ সালে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবার পরেই যুক্ত নির্বাচনের প্রশ্ন গুরুত্ব লাভ করে। ব্রিটিশ আমলের মুসলিম লীগ দাবি করেছিল তারাই মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি। তাই তারা পৃথকভাবে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। অপরদিকে কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ও সকল ভারতবাসীর প্রতিষ্ঠান বলে মনে করত। তাই তারা যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ও মুসলিম লীগের আঁতাতে স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয় এবং একই সময় অনুন্নত বলে তফশিল সম্প্রদায়ের জন্যে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচন সম্পর্কে এই উত্তরাধিকার নিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামে বিভক্ত হয়। তাই পাকিস্তান মুসলিম লীগের নীতিগতভাবেই যুক্ত নির্বাচন করার কোনো উপায় ছিল না। আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার পরে এ দাবি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে।
