শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের অজুহাতে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ৫ আগস্ট পদত্যাগ করলেন। এবার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মীর্জা। প্রধানমন্ত্রী হলেন মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন একে ফজলুল হক, যাকে মাত্র কিছুদিন আগে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করে পূর্ববাংলায় ৯২(ক) ধারা জারি করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী পুনরায় রাষ্ট্রদূত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিরোধী দলের নেতা হলেন। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যপদ ত্যাগ করলেন। এবার শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে আরেক অধ্যায়।
সারা পাকিস্তানজুড়ে তখন এক অভাবনীয় রাজনীতির খেলা চলছিল। কোনো আদর্শ বা নীতির বালাই ছিল না। ব্যক্তিস্বার্থ ছিল মূলকথা এবং এটাই ছিল স্বাভাবিক। পাকিস্তানের জন্ম কোনো স্থির বিশ্বাসের পরিণতি নয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দাবি সফল হবে এ কথা অনেক মুসলিম লীগ নেতা বিশ্বাস করতেন না। ভারত বিভাগের সময় পাকিস্তানের দু’অংশে রাজনৈতিক চিত্র ছিল পরস্পরবিরোধী। সিন্ধু, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ (বেলুচিস্তান) ছিল জোতদার ও জমিদারের দেশ। একশ্রেণির পাঞ্জাবিরা সেনাবাহিনীতে ছিল। সিন্ধু এবং পাঞ্জাবের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সর্বকালে জোতদার ও জমিদারদের হাতে ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এককালে তীব্র ছিল পাঞ্জাবে। কিন্তু সে নেতৃত্ব ছিল শিখ ও হিন্দুদের হাতে। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের অধিকাংশ মুসলিম নেতৃত্ব ছিল জমিদার ও ব্রিটিশ সরকারের অনুগত। রাজনৈতিক আদর্শের বালাই ছিল না। দলত্যাগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। সিন্ধু ও পাঞ্জাবে এককলে কিছুটা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় তা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়।
অপরদিকে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের চিত্র ছিল একান্তই ভিন্ন। এরা ধর্মবিশ্বাসে গোড়া মুসলমান। কোনোদিনই ব্রিটিশ সরকারের কাছে মাথা নত করেনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এরা কংগ্রেসের সহযোগিতা ও সহানুভূতি পেয়েছে। এই প্রদেশে কংগ্রেস শক্তিশালী ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় এই প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ছিল। নেতৃত্বে ছিলেন সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খান। সীমান্ত প্রদেশের কংগ্রেস দেশবিভাগের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। এ প্রদেশটি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। এদের সান্তনা দেবার জন্যে ব্রিটিশ ও কংগ্রেস সীমান্ত প্রদেশে গণভোটের ব্যবস্থা করে। বলা হয়েছিল, সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসীরা ভারত কিংবা পাকিস্তানে যাবে। গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। সীমান্তের কংগ্রেস এ গণভোট পাত্তা দেয়নি। গণভোটে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তানে যোগ দেয়।
উপরের চিত্র থেকে পরিষ্কার যে, পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো একক রাজনীতি বা একক নেতৃত্ব ছিল না। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে কোনো প্রদেশেই মুসলিম লীগ সরকার ছিল না। ফলে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মুসলিম লীগ তেমন শক্তিশালী ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানে। তবুও জিন্নাহ-লিয়াকত আলী জীবিত থাকা পর্যন্ত রাজনীতিতে মুসলিম লীগের কিছুটা নেতৃত্ব ছিল। তাদের মৃত্যুর পর সে নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে।
তখন আর একটি ঘটনা ঘটে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে। দেশ বিভাগের ফলে এ দুটি প্রদেশ থেকে লাখ লাখ হিন্দু ও শিখ ভারতে চলে যায়। ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসে লাখ লাখ মুসলমান। একই সঙ্গে ভারত থেকে পাকিস্তানে আসে ব্রিটিশ আমলের আমলারা, বম্বে ও গুজরাটের ব্যবসায়ীরা। নিজস্ব ব্যক্তি ও শ্রেণিস্বার্থেই এরা পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। পাকিস্তানের রাজনীতিকদের দুর্বলতার জন্যে এবং অনিবার্য কারণে পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে সামরিক বাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তা জন্মসূত্রে পাঞ্জাবি এবং জমিদার শ্রেণির। দেশ বিভাগের মুহূর্তে কাশ্মীর নিয়ে সংঘর্ষসহ বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারাও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
এর আবার একটি ভিন্ন কারণও ছিল। এ কারণটি হচ্ছে পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশের প্রতিযোগিতা। পাকিস্তান ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। পাকিস্তানে ব্রিটিশ সহায়-সম্পত্তি ছিল। পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথে ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ছিল ব্রিটিশ মুদ্রা অর্থাৎ স্টার্লিং ব্লকে।
অথচ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী পরিবেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান হয়ে ওঠে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সীমান্তে বৃহৎ দু’টি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাকিস্তানের পাশে ভারত জোটনিরপেক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় সোভিয়েতপন্থী।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল পাকিস্তানকে কজায় নিতে। এক সময় সাহায্যের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটি অংশের ব্যয়ভার বহন করত। পেশোয়ারের বিমানঘাঁটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিত। ফলে ব্রিটিশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব তুঙ্গে ওঠে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনেকের ধারণা এই দ্বন্দ্বেই রাওয়ালপিণ্ডির ষড়যন্ত্রের নামে সামরিক বাহিনীর একশ্রেণির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হয়। আইয়ুব খান অনেককে ডিঙিয়ে প্রধান সেনাপতি হন। সোভিয়েত ইউনিয়নের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। পরবর্তীকালে রাওয়ালপিণ্ডির এক জনসভায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। সে হত্যা মামলার কোনো তদন্ত হয়নি। লিয়াকত আলীকে হত্যা করেছিল সীমান্ত প্রদেশের হাজরা জেলার সৈয়দ আকবর। সে তখন অন্তরীণ ছিল। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খাজা শাহাবুদ্দিন। খাজা শাহাবুদ্দিনের বড়ো ভাই খাজা নাজিমুদ্দিন তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল। লিয়াকত আলী নিহত হবার পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। গভর্নর জেনারেল হন আমলাদের প্রখ্যাত নেতা গোলাম মোহাম্মদ। এই গোলাম মোহাম্মদই পরবর্তীকালে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পদচ্যুত করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে ডেকে এনে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের রাজনীতিতে তখন পিছু হটছে ব্রিটিশ। এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানই ছিল তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্র।
