আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেলাম। আদৌ ভাবতে পারিনি যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা মওলানা সাহেবের কথা মেনে নিতে পারলাম না। বললাম, এই ঝানু আমলাদের বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই। এছাড়া আমরা সংখ্যাসাম্য মানব কেন? এমনিতেই সব ব্যাপারে বাঙালিরা বঞ্চিত হচ্ছে। এবার সাংবিধানিকভাবে আমাদের বঞ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা গভর্নর জেনারেল বা প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করি না। মওলানা সাহেব আমাদের সঙ্গে তেমন বিতর্কে যোগ দিলেন না।
আমাদের এই কথাবার্তার মধ্যে তার চিরপরিচিত ভাঙা বাংলায় কথা বলতে বলতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমাদের কক্ষে ঢুকলেন। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বললেন-তোমাদের কথা আমি বুঝি। কিন্তু কাউকে তো বিশ্বাস করতে হবে। সকলকে অবিশ্বাস করলে তো চলবে না। গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী আমাদের পাকা কথা দিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের শর্ত মেনে নেবেন।
এবার বিস্ফোরণ ঘটল–আবদুল গাফফার চৌধুরী বললো–শহীদ সাহেব, আপনার সব কথাই আমরা বুঝি। তবে আমাদের ধারণা হচ্ছে আপনাদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিয়ে একদিন আপনাকেই মন্ত্রিসভা থেকে কিক আউট করবে। গাফফারের কথার তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। মোমিন তালুকদার ও নুরুল ইসলাম ক্ষিপ্ত হলো। আমাদের আলোচনা তেমন আর এগুল না। এক সময় মওলানা সাহেব ও শহীদ সাহেব আমাদের কক্ষ থেকে। চলে গেলেন। রাত তখন শেষ। আমরা ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ি দোতলা থেকে নিচতলায় নামলাম। দেখলাম কতিপয় তরুণ কিছু হ্যান্ডবিল বিতরণ করছে। তারা আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং তারা আওয়ামী লীগেরই লোক।
ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে নবাবপুর রোড দিয়ে হাঁটছিলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। যতদূর প্রতিবাদ করার কথা ছিল তা করতে পারলাম না। আওয়ামী লীগ এ প্রস্তাব মেনে নিল। প্রতিরোধ করার মতো কোনো শক্তিই দেশে থাকল না। কারণ শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি শেষ পর্যন্ত আপোষ করবেই। মৃত মুসলিম লীগ ও অর্ধমৃত কংগ্রেস কাগজপত্রে বয়কট করলেও রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। আর ৯২(ক) ধারার যাতাকলে বামপন্থীরা বিপর্যস্ত। কেউ জেলে। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
২৭ ফেব্রুয়ারি শুনলাম অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এ প্রস্তাব পাস করাতে হয়েছে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদে। তিনি লিখিতভাবে মুচলেকা দিয়েছেন… আমি এতদ্বারা ঘোষণা করছি যে, ২২ দফা ও যুক্ত নির্বাচন প্রস্তাবাবলি কনিস্টিটিউশন কনভেনশনে গ্রহণ করবার লক্ষ্যে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব–যতদূর পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যর্থ হলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করব।
কিন্তু এত করেও আওয়ামী লীগ হালে পানি পেল না। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সদস্যরা মনোনয়নপত্র দাখিল করল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, তোফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ও আলি আহমাদসহ আওয়ামী লীগ সদস্যরা মনোনয়নপত্র দাখিল করলেন। অন্য কোনো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল না। ধারণা সৃষ্টি হলো যে, পূর্ববাংলা থেকে আওয়ামী লীগের শতকরা একশ জন সদস্যই নির্বাচিত হবে। কিন্তু গভর্নর জেনারেলের তখন অনেক খেলা বাকি। তিনি মনোনয়নের তারিখ পিছিয়ে দিলেন। ইতোমধ্যে ফেডারেল কোর্ট গভর্নর জেনারেলের সংবিধান কনভেনশনের নির্দেশ বাতিল করে দিল। ফেডারেল কোর্টের পক্ষ থেকে বলা হলো–সংবিধান কনভেনশন নয়, সংবিধান প্রণয়নের জন্যে গণপরিষদ গঠন করতে হবে। এই গণপরিষদ গঠনের জন্যে ২৮ মে নতুন নির্দেশ জারি করা হলো। গভর্নর জেনারেল নির্দেশ দিলেন ১৯৫৫ সালে ২৮ মে গণপরিষদ গঠনের। এই গণপরিষদের দুই ইউনিটের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠিত হবে। গণপরিষদে সংখ্যাসাম্য থাকবে। পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ জন করে সদস্য থাকবেন। নির্বাচনে পূর্ববাংলার ৩১ জন মুসলমান ও ৯ জন অমুসলমান নির্বাচিত হলো। কারণ তখন স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি চালু ছিল। ৩১ জন মুসলিম সদস্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেল ১২; কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্র দলের কোয়ালিশন পেলো ১৬, মুসলিম লীগ একটি ও স্বতন্ত্র দুটি। মুসলিম লীগ সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন কেন্দ্রের আইনমন্ত্রী। গণপরিষদে তার সমর্থক সংখ্যা ১২। এর পরেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন। এ আশ্বাসই নাকি গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দিয়েছেন।
কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি কাজে এল না। প্রতিশ্রুতি ভাঙার পালা শুরু হলো পূর্ববাংলার নতুন সরকার গঠন নিয়ে। পূর্ববাংলার প্রাদেশিক পরিষদের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু তাদের ক্ষমতা দেয়া হলো না। অসুস্থতার জন্যে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ সুইজারল্যান্ড গিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীও সুইজারল্যান্ড গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে কিছু সমস্যা নিয়ে আলাপের জন্যে। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী এ সুযোগ নিলেন। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন পূর্ব বাংলা থেকে ৯২(ক) ধারা তুলে নেয়া হলো। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল মন্ত্রিসভা গঠনের জন্যে তাদেরই ডাকা হবে। কিন্তু ডাকা হলো যুক্তফ্রন্টের নামে কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামকে। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন আবু হোসেন সরকার। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।
