আমি এ প্রস্তাব সম্পর্কে পূর্বে কারো সঙ্গে আলাপ করিনি। তবে জানতাম সভাপতি ও সম্পাদক আমার প্রস্তাব পছন্দ না করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলবেন না। আমার প্রস্তাব শুনে দু’জনেই গম্ভীর হয়ে গেলেন। ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ বললেন, ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ ব্যতীত কোনো প্রস্তাবে একমত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
আমাদের বৈঠক ভেঙে গেল। আমার ধারণা ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনয়নের ঐক্যের এটাই বোধ হয় ছিল সর্বশেষ প্রচেষ্টা। আমি ছাত্র রাজনীতি থাকাকালীন ভিন্ন কোনো প্রচেষ্টা হয়েছে বলে শুনিনি। এ প্রচেষ্টা ভেঙে যাবার পর আমারও ছাত্রলীগ থেকে যাবার দিন ঘনিয়ে এল। বিপদ বাড়ল আমার এবং আমাদের। আমরা যারা কোনোদিনই চাইনি যে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় হোক তাদের অসুবিধা হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নীতির বিরু কোনো কিছু করা বা বলা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে গেল। অপরদিকে কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের সকল নীতির প্রতিবাদ করতে থাকলেন। আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুখ চেয়ে। কিছুই বলতে পারল না।
এ মুহূর্তে নতুন সঙ্কট দেখা দিল গণপরিষদ নিয়ে। ইতোপূর্বে ২৩ অক্টোবর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর সিন্ধুর চিফ কোর্ট গণপরিষদ বিলুপ্তির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে। গভর্নর জেনারেল এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সিন্ধু চিফ কোর্টের রায় বাতিল করেন এবং অবিলম্বে সংবিধান প্রণয়নের জন্যে একটি সংস্থা গঠনের আদেশ দেন। সেই আদেশ অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল ১৫ এপ্রিল আর একটি আদেশ জারি করেন। এই আদেশের নাম হচ্ছে সংবিধান কনভেনশন আদেশ। এই আদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল আরো কিছু শর্ত। এই শর্তে বলা হয় পাকিস্তান দুই ইউনিটে বিভক্ত হবে। পূর্ব পাকিস্তান হবে একটি ইউনিট এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে গঠিত হবে আর একটি ইউনিট। পশ্চিম পাকিস্তানের ৪ প্রদেশের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সর্বক্ষেত্রে সংখ্যা সাম্যনীতি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা শতকরা ৫৬ ভাগ হলেও তারা পশ্চিম পাকিস্তানের মতোই ৫০ ভাগ সুযোগ-সুবিধা পাবে। এর নাম ছিল সংখ্যাসাম্য। এই প্রস্তাবনার ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আপোষহীন। তিনি হুমকি দিলেন যে, প্রয়োজনবোধে সামরিক বিধানের মাধ্যমে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হবে।
এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সমগ্র পূর্ব বাংলার সকল মহল বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। কৃষক শ্রমিক পার্টি, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলো। তারা সংবিধান কনভেনশন বয়কটের প্রস্তাব গ্রহণ করল। এ সময় ইস্কান্দার মীর্জা ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এলেন। ইস্কান্দার মীর্জা কৃষক শ্রমিক পার্টিকে তাদের প্রস্তাবনা বোঝাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কৃষক শ্রমিক পার্টি মীর্জার প্রস্তাবে রাজি হলো না। শুধুমাত্র শহীদ সোহরাওয়াদী আওয়ামী লীগকে সম্মত করালেন। আওয়ামী লীগ কনভেনশনে যোগ দিতে সম্মত হলো। সারাদেশে তখন আওয়ামী লীগ সমালোচিত। আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে কলকাতাতে অবস্থান করছেন। তিনি কলকাতা থেকে বিবৃতি দিয়ে সংবিধান কনভেনশনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেন। কিছুটা হলেও আওয়ামী লীগের মুখ রক্ষা হলো।
কিন্তু সবকিছু পাল্টে গেল মওলানা ভাসানীর ঢাকা আগমনের পর। ২৫ এপ্রিল মওলানা সাহেবকে নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় পৌঁছালেন। সেই একটি রাতের কথা আমার এখনও মনে আছে। আমি তখন ঢাকা হলে থাকি। গভীর রাতে আমাদের হলে এলেন ছাত্রলীগের এককালীন সভাপতি বর্তমান শিক্ষক নেতা কামরুজ্জামান সাহেব। বলা হলো–ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের মওলানা ভাসানী ডেকেছেন। আমাদের যেতে হবে পুরান ঢাকার কারকুন বাড়ি লেনে জনাব ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ি। গভীর রাতে আমরা সেখানে হাজির হলাম। আমাদের মধ্যে ছিল আব্দুল মোমিন তালুকদার, এমএ আউয়াল, নূরুল ইসলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আব্দুল জলিল এবং ছাত্র ইউনিয়নের এসএ বারী, আব্দুস সাত্তার প্রমুখ। আমরা জানতাম না কেন আমাদের ডাকা হয়েছে। শুধু এটুকু জানতাম যে সংবিধান সম্মেলনে যোগদান নিয়ে আওয়ামী লীগে বিরোধ চলছে। ওই সম্মেলনে যোগ দেয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও হয়নি। আমাদের ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে না।
আমরা নিজেদের মধ্যে এই আলোচনাই করছিলাম। ইতোমধ্যে মওলানা সাহেব আমাদের কক্ষে এসে ঢুকলেন। কুশল বিনিময় করলেন। বললেন, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী তাঁকে কথা দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের তিনটি শর্ত তারা মেনে নেবে। শর্ত তিনটি হচ্ছে–(১) প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, (২) রাজবন্দিদের মুক্তি, (৩) যুক্ত নির্বাচন। মওলানা সাহেব বললেন, এই তিন শর্তে তিনি সংবিধান সম্মেলনে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর তিনি আমাদের মতামত জিজ্ঞেস করলেন।
