একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির এই ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রফ্রন্ট হিসেবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম-ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবে না। হতে পারে না। এর মধ্যে একদিন আউয়াল জানাল, নির্মল ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হয়েছে-সাতজন সভায় উপস্থিত ছিল। সর্বসম্মত হয়েছে তারা ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। আমার তেমন বিশ্বাস হলো না।
কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে দেখি মহা হইচই। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। সে বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগকে ঐক্যের জন্যে আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। ছাত্র ইউনিয়নের বিজ্ঞপ্তি পড়লে মনে হবে, তারাই ঐক্যের অগ্রদূত। তারাই এগিয়ে এসে আহ্বান জানিয়েছে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের। তাদেরই ত্যাগের ফল ঐক্যবদ্ধ অর্থাৎ ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান।
সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। অনেকেই জানত যে, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্যবদ্ধ হবার প্রচেষ্টা চলছে। হঠাৎ এ ধরনের প্রচারপত্র আমাদের সবাইকে হতভম্ব করে দিল। তবে আমার কাছে ছাত্র ইউনিয়নের এই প্রস্তাব সঠিক বলে মনে হলো না। দীর্ঘদিন পরে একটি সংগঠনের অপর একটি সংগঠনে অবলুপ্ত হওয়া সহজ নয়। এতে মতানৈক্য হতেই পারে। শুনলাম ছাত্র ইউনিয়নের কমিটির পূর্ণাঙ্গ সভায় এবং কাউন্সিলে ছাত্রলীগের নামে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। তারা নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। তাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু বিপদে পড়লাম আমরা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও খুশি হয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হবার প্রস্তাবে। কারণ ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম। তাই এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ঢাকার বাইরে দু’টি সংগঠনকে পৃথক করে দেখা হতো না। আওয়ামী লীগের সকল সভায়ই ছাত্রলীগ নেতারা বক্তৃতা দিতেন। সাধারণ সম্পাদক এমএ আউয়াল ও আমি এর বিপক্ষে ছিলাম। আমাদের বক্তব্য ছিল–ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় নয়। তাই আওয়ামী লীগের সভায় ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তৃতা দিতে হলে আগে লিখিতভাবে ছাত্রলীগকে অনুরোধ করতে হবে। ছাত্রলীগ অনুমোদন করলেই একমাত্র ছাত্রলীগ নেতারা আওয়ামী লীগের মঞ্চে বক্তৃতা দিতে পারবে। আমাদের মনোভাবের ফলে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, আমি একদিন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভার মঞ্চ থেকে বক্তৃতাদানকারী একজন ছাত্রলীগ নেতাকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। এ ঘটনা অনেকেই ভালো চোখে দেখত না। অপর দিকে তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। ছাত্রলীগের ওপর আওয়ামী লীগের প্রভাব বাড়ছে। ব্যক্তিগতভাবে এমএ আউয়াল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রিয়পাত্র। ফলে পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। আমি ভেবেছিলাম ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হলে হয়তো ছাত্রলীগকে নিরপেক্ষ রাখা যাবে। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের এই বিজ্ঞপ্তির পর মনে হলো সবকিছু ভেস্তে যাচ্ছে।
তবুও একটা বৈঠকের ব্যবস্থা করা হলো। বৈঠক বসবে ১৫৭ নম্বর। নবাবপুর রোডে। ছাত্রলীগ অফিসে। জন্মলগ্নে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম অফিস ছিল ৯০ মোগলটুলীতে। মুসলিম শব্দটি তুলে দেবার প্রশ্নে ছাত্রলীগ দু’ভাগ হয়ে যায়। যারা মুসলিম শব্দ তুলে দেবার পক্ষে ছিল তাদের অফিস স্থানান্তরিত হয়ে ১৫৭ নম্বর নবাবপুর রোডে। এই দফতরটিও আমরা বিনা ভাড়ায় পেয়েছিলাম। ছাত্রলীগের জন্মের প্রথম দিকে এক বন্ধু এই দফতরটি আমাদের দিয়েছিলেন। আমি ছাত্রলীগে থাকা পর্যন্ত এ ভবনেই ছাত্রলীগের অফিস ছিল।
সেদিন ঐক্য সম্পর্কিত বৈঠক বসার কথা ছিল বেলা ৯টায়। ৯টার মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এসএ বারী এটি, আনোয়ারুল আজিম এবং আব্দুস সাত্তারসহ অনেকেই আমাদের অফিসে উপস্থিত হলেন। ছাত্রলীগের সম্পাদক এমএ আউয়াল পৌঁছালেন বেলা দশটায়। তাকে আমি বিলম্বে আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই এমএ আউয়াল ক্ষিপ্ত হলেন। তিনি বললেন-ছাত্র ইউনিয়নের এই নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। তারা কথা দিয়ে কথা রাখেনি। আমাদের না জানিয়ে তারা তাদের নিজস্ব প্রস্তাব বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছেন। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ধারণা হয়েছে আমরাই ঐক্য চাই না। এ পরিস্থিতিতে তাদের সাথে নতুন করে ঐক্য নিয়ে আলোচনা করার কোনো অবকাশ নেই। তারা জানে, ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ গঠনের দাবি আমরা কিছুতেই মেনে নেব না। সাধারণ ছাত্ররা এ ঐক্য প্রক্রিয়ার পূর্ব ইতিহাস জানে না। তাই মনে করবে ছাত্র ঐক্য না হবার জন্যে আমরাই দায়ী।
আমার মনে হলো দুই সংগঠনের ঐক্যের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আউয়ালের মন্তব্যগুলো অপমানজনক। ভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিজেদের দফতরে আমন্ত্রণ জানিয়ে এ ধরনের কথাবার্তা আদৌ রুচিকর নয়। তবুও আমি শেষ চেষ্টা করলাম। আমি একটি নতুন প্রস্তাব দিলাম ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের কাছে। আমি বললাম, আমাদের সভাপতি আব্দুল মোমিন তালুকদার, সম্পাদক এমএ আউয়াল এবং দফতর সম্পাদক আমি নির্মল সেন একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে দিচ্ছি। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে-দুটি সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হবার পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগই নাম থাকবে। তবে ঐ সংগঠনের কর্মকর্তা হিসেবে যাদের নামই আপনারা লিখে দেবেন আমরা তিনজন সে কমিটি মেনে নেব। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।
