প্রকৃতপক্ষে আমার পক্ষে গ্রেফতার হওয়া সম্ভব ছিল না। হল থেকে দূরে চলে গেলাম। তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আউয়াল। সভাপতি আব্দুল মমিন তালুকদার। যতদূর মনে আছে ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে মিছিল করার চেষ্টা করায় ২১ ছাত্রীসহ অনেক ছাত্র গ্রেফতার হয়ে গেল। পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হলো-পুলিশ প্রহরায়। গ্রেফতারের মধ্যে ছিল এমএ আউয়ালসহ অনেক ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। মাসখানেক পরে জেলখানা থেকে সকলে ছাড়া পেল।
জেলখানা থেকে বের হয়ে আউয়াল আমাকে জানাল-ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা জেলে আলাপ-আলোচনায় সম্মত হয়েছে ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হতে। ছাত্র ইউনিয়ন আগামীতে তাঁদের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকবে। কাউন্সিল ডাকবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছে ছাত্রলীগের ফরিদপুর জেলা কমিটির নেতা লিয়াকত হোসেন। লিয়াকত তখন জেলে ছিল। অনেকে বলল, লিয়াকত বিশ্বাসের দিক থেকে কমিউনিস্ট পার্টির কাছাকাছি এবং বরাবরই সে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যের কথা বলেছে। ঐক্যের প্রশ্নটি খুব জোরালো ছিল দেশের ছাত্র রাজনীতিতে। ছাত্রলীগের প্রতীক ছিল-শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্য, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। প্রশ্ন হতো, ছাত্রলীগের প্রতীক ঐক্য নয় কেন? তাহলে কি ছাত্রলীগ ঐক্য চায় না?
একবার রাজশাহীতে ছাত্রসভায় এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলাম আমি ও মমিন তালুকদার। ছাত্রসভায় প্রশ্ন উঠল–আপনাদের প্রতীক ঐক্য নয় কেনো? আপনারা কি ঐক্য চান না? ছাত্রলীগের সভাপতি তালুকদার সাহেব জবাব দিলেন–যে শিক্ষা ঐক্য শেখায় না সে শিক্ষা আদৌ শিক্ষাই নয়। তাই আমাদের সংগঠনের প্রতাঁকের মধ্যে ঐক্য নেই।
মনে হলো, ছাত্ররা খুশি হলো না। আমি বললাম, দেখুন আমি জবাব দিতে পারি। আপনারা রাগ করবেন না তো? কারণ যারা প্রশ্ন করছেন তাঁরা সকলে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। আমার কথা কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যাবে।
আমার কথা হচ্ছে-ছাত্রলীগ গঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। তখন ঐ প্রতিষ্ঠানেরই সদস্য ছিলেন পরবর্তীকালে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতারা। তাই সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সংগঠন করায় ঐক্যের প্রশ্ন ওঠেনি। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। এ ব্যাপারে আমি পূর্বেই লিখেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠন ছিল তৎকালীন আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগের ফসল। দেশ বিভাগের কালে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল ছাত্র ফেডারেশন [এই ছাত্র ফেডারেশন ছিল নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন অনুমোদিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের অঙ্গ]। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এ নামে পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করায় অসুবিধা দেখা দেয়। এ নামের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি জড়িত এবং প্রতিষ্ঠান ভারতের একটি সংগঠনের অঙ্গ। ফলে পাকিস্তান ছাত্র সংগঠনের নাম পাল্টাবার প্রশ্ন দেখা দেয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত নতুন কোনো সংগঠন। করা সম্ভব ছিল না। তাই কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর নিজস্ব ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগ পর্যন্ত এরা কেউ ছাত্র ফেডারেশনের নামে, কেউ আবার ছাত্রলীগের নামে কাজ করত। এমনকি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর ও ময়মনসিংহে ছাত্র ইউনিয়ন কোনো কমিটি গঠন করেনি। ঐ দুটি জেলায় তারা ছাত্রলীগের মাধ্যমে কাজ করত। এ দু’টি জেলা কমিটি মুখ্যত কমিউনিস্ট পার্টির পরামর্শেই চলত।
একই কাজ আরএসপি করেছিল ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। তাদের প্রভাবিত ছাত্র প্রতিষ্ঠান নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের নাম পাল্টে রাখা হয় পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন–পিএসএ।
এ পটভূমি মনে রেখেই আমি রাজশাহীতে ছাত্রসভায় বলেছিলাম, ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে প্রথম ভাঙন সৃষ্টি করা হয়। এবং যারা এই ভাঙন সৃষ্টি করেছিল তারাই প্রতীক নিয়েছিল ঐক্য। ছাত্রলীগ যখন গঠন হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, তখন ঐক্যের প্রশ্ন ওঠেনি। যারা ভেঙেছে তারাই ঐক্যের কথা বেশি বলছে। কারণ ১৯৫২ সালে শুধুমাত্র অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে নতুন সংগঠন গঠনের প্রয়োজন ছিল না। কারণ ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে কাউন্সিলে ঐ প্রস্তাব পাস করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৩ সালে এ সিদ্ধান্ত কাউন্সিলে চূড়ান্ত হয়। সকলেই জানত এ ঘটনা ঘটবে–যেমন ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেয়া হলেও এর আগে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার মনোনয়ন নিতে অসুবিধা হয়নি। এমনটি ১৯৫৪ সালে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী দলের টিকেটে নির্বাচিত হয়ে বরিশালের মহিউদ্দীন আহমেদ এবং আব্দুল করিম পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। সুতরাং এ নিয়ে কথা না বাড়ানো অনেক ভালো। সবকিছু হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের ফলে। তাই আমি আউয়ালকে বলেছিলাম, ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবে না। কমিউনিস্ট পার্টি এ সিদ্ধান্ত মানতে পারে না।
