আমাদের এ দু’টি প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া গেলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা কঠিন নয়। তবুও কামরুন্নাহার লাইলী চাপ দিতে থাকল আমাদের আলোচনায় বসাবার জন্যে। সর্বশেষ আমি বললাম, লাইলী এত ভেবে লাভ নেই। তোদর পার্টি আমাদের সঙ্গে বসবে না। বললেন, নির্মল সেন আত্মগোপন করলেও ৯২(ক) ধারায় আদলে তাদের নেতা নিতাই গাঙ্গুলী তার কার্যে বহাল তবিয়তে আছে। এরা সরকারের দালাল। তাদের সঙ্গে বসা যাবে না না। ঝুঁকি আছে। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি অন্য কাউকে কমিউনিস্ট মনে করে না। মনে করে মার্কিন দালাল। ওরা ছাড়া সাচ্চা কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল আর কেউ নেই। লাইলী আমাদের কথা বিশ্বাস করল না।
এরপর ক’দিন লাইলীর দেখা নেই। লাইলী এল ২৭ আগস্ট। সিদ্দিককে বলে গেল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠক হবে না। কারণ তারা মনে করে আরএসপি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। ওদের সঙ্গে বসলে ঝুঁকি আছে। সিদ্দিক মাস তিনেক হাসপাতালে থাকার পর বরিশাল চলে গেল। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠকের পর্ব এভাবে শেষ হলো। দেশের রাজনীতিতে তখন ভিন্ন। নাটক।
রাজনীতিতে সকলের দৃষ্টি তখন করাচির দিকে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রী হবেন-এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি দেশে নেই বলে মন্ত্রিসভায় যোগ দেননি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের সিদ্ধান্ত, শহীদ সোহরাওয়াদীকে ঠেকাতে হবে। তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিলে আর রাজনীতি করা যাবে না।
ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শহীদ সোহরাওয়ার্দী করাচি ফিরলেন। করাচিতে আওয়ামী লীগের আট নেতার বৈঠক। সকলেরই মত প্রধানমন্ত্রীত্ব পেলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভায় গেলে আপত্তি নেই। কিন্তু শহীদ সাহেব ভিন্ন কথা বললেন। তিনি বললেন, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তাকে ছ’টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিশ্রুতি ছ’টি হচ্ছে–(১) শহীদ সাহেব মন্ত্রিসভায় ঢুকবার তিনদিন (মতান্তরে তিন সপ্তাহ) পরে তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। (২) আওয়ামী লীগের আরো দু’জন মন্ত্রী নেয়া হবে। (৩) সংবিধান রচনার ভার শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওপর দেয়া হবে। (৪) ছ’মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা শেষ করে একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করা হবে। (৫) এক বছরের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন হবে। (৬) নতুন সংসদে সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ অধিকার থাকবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ রাজি হলেন না। তাদের যুক্তি-কদিন পরেই যখন শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হবেন, তখন আর আগে যোগ দিয়ে লাভ কি? কদিন পরে শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই মন্ত্রিসভা গঠন করুক। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোনো কিছুই মানলেন না। তিনি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন ২০ ডিসেম্বর। পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো, কেন্দ্রীয় সরকার শহীদ সাহেবকে দেয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই মানছে না। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব মুক্তি পেলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের নতুন কোনো মন্ত্রী নেয়া হলো না। উপরন্তু কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা আবু হোসেন সরকারকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হলো।
আমরা তখন সকল ঘটনার নীরব সাক্ষী। দেশে ৯২(ক) ধারা অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট শাসন। সভা মিছিল সমাবেশ করা মুশকিল। অপরদিকে নেতৃত্বের কোন্দল। প্রগতিশীল শক্তি বিভ্রান্ত। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেও যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাক তা কেউ চায়নি। অথচ মনে হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা যুক্তফ্রন্ট ভাঙতে চাচ্ছে। সেই ষড়যন্ত্রে জেনে হোক না জেনে হোক শরিক হয়েছেন সকল দলের নেতবৃন্দ। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়।
কিন্তু অনাস্থা প্রস্তাব এনে আওয়ামী লীগ লাভবান হলো না। কারণ পরিষদের সকলেই ছিল যুক্তফ্রন্টের মনোনীত সদস্য। কেউ আওয়ামী লীগ বা কেএসপির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়নি। তাই আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির সদস্য যুক্তি দেখাল–আমরা আওয়ামী লীগের নির্দেশ মানতে রাজি নই। নির্দেশ হতে হবে যুক্তফ্রন্টের। ফলে হক সাহেবের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে আওয়ামী লীগ জিততে পারল না। আমরা শুধু দেখলাম। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের নতুন নেতা নির্বাচিত হলো। ভোট নিয়ে অনেক হইচই হলো। বিকেলে টেলিগ্রাম বের হলো। উভয় পক্ষই দাবি করলেন তারাই জিতেছেন। আওয়ামী লীগ গ্রুপের নেতা হলেন আতাউর রহমান খান। কৃষক শ্রমিকের পার্টি কেএসপি দাবি করল অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়নি। তাই তাঁরা জিতেছেন।
আমাদের মনে হলো, জিতেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদে পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলার নেতৃত্বে মুসলিম লীগের রাজনীতি। পূর্ব পাকিস্তানে যুজফ্রন্টের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারা আতঙ্কিত হয়েছিল। এবার তাদের শঙ্কা দূর হলো। আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হলো পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট। এগিয়ে এলো ২১ ফেব্রুয়ারি।
২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। ১৯৫৪ সালের সাড়ম্বরে পালিত হয়েছিল। এবার ১৯৫৫ সালে দেশে কোনো মন্ত্রিসভা নেই। মিছিল করা যাবে না। কোথাও গোপন বৈঠকও করা যাচ্ছে না। হলে হলে পুলিশের এজেন্ট। তাদের মধ্যে অনেকে এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। তখনকার লালবাগ থানার ওসির বাড়ি ছিল বরিশালে। তার এক ছোট ভাই একদিন আমার কাছে ঢাকা হলে এল। বললো, সরে যান। ভাইজান পাঠিয়েছে, আজ আপনাদের গ্রেফতার করতে পারে। আপনি গ্রেফতার হলে বিপদ হবে। আপনার বিরুদ্ধে খুনের মামলা আছে।
