তাও রাজনীতি এড়ানো গেল না। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৯৫৪ সালে চারদিকে বন্যা। ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ সিদ্ধান্ত রিলিফ দিতে হবে। টাকা, কাপড় তুলতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের গ্রুপ ভাগ করে পাঠাতে হবে বিভিন্ন এলাকায়। এ নিয়ে একদিন বৈঠক বসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন ডাকসুর অফিসে। বৈঠকে একজন ছাত্রী বলল, তারা কিছুতেই ছেলেদের সঙ্গে যাবে না। তাকে আমি চিনি না। মনে হলো সে নেত্ৰীস্তরের হবে। এ নিয়ে সকলেই উত্তেজিত, বিতর্কে লিপ্ত। এক সময় হঠাৎ আমি বলে ফেললাম, তোমরা কেউ গেলে ভোরবেলা হলে গিয়ে কানধরে নিয়ে আসা হবে।
সকলে একেবারে নীরব হয়ে গেল। বিতর্কের ছাত্রীটি আমার কাছে এল। বলল, ঠিক আছে আমরা যাব। তবে আপনি ভোরবেলা এসে গ্রুপ ভাগ করে দেবেন। আপনাদের বিগলিত ব্যানার্জি মার্কা ছাত্রদের সঙ্গে আমরা যাব না। শুনলাম ছাত্রীটির নাম কামরুন্নাহার লায়লী। বাড়ি পিরোজপুরে। ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী। পরদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি। শুনেছি ছাত্রছাত্রী সকলে এসেছে। গ্রুপ ভাগ করে চলে গেছে রিলিফের জন্যে টাকা আদায় করতে। ক’দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলের কিছু ছাত্রীর বরাত দিয়ে আমার কাছে একটি চিঠি এল। সে চিঠিতে লেখা ছিল, আমরা শুনেছি আপনি আত্মগোপন করে আছেন। অর্থকষ্টে আছেন। আমরা আপনাকে অর্থ সাহায্য করতে চাই। কী করা যায়, আমাদের জানাবেন।
আমি জানতাম এদের মধ্যে অধিকাংশ ছাত্র ইউনিয়ন অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক। হয়তো এরা আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বলে ধারণা করেছে এবং সাহায্য করতে চাচ্ছে। আর সেকালে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল–সকল বিপ্লবীরাই কমিউনিস্ট পার্টি করে। সকল মার্কসবাদী, লেনিনবাদীরাই কমিউনিস্ট। পূর্ব বাংলায় যে এককালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি)সহ অনেক বামপন্থী দল ছিল তা অনেকেরই জানা ছিল না। দেশ বিভাগের পর অনেক নির্যাতন সহ্য করেও কমিউনিস্ট পার্টি নিজস্ব কাঠামো ধরে রাখতে পারলেও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চরমভাবে। আমি ভাবলাম নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলার প্রয়োজন। অন্যের পরিচয়ে সাহায্য নেয়া অন্যায়। তাই তাদের জানালাম, আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নই। আমি বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল করি। সুতরাং আপনারা নিজের দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আর এ মুহূর্তে আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
এবার প্রশ্ন উঠল আরএসপি কী? কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাদের তফাৎ কী। এ দুটি দল কি এক হতে পারে না? একদিন কামরুন্নাহার লাইলী এসে বললো, আপনাদের দু’দলের বসতে হবে। আমরা চাই আপনারা এক হোন। আমি বললাম, তুমি ব্যবস্থা করো। আমরা রাজি। লাইলীর সঙ্গে তখন আমার সম্পর্ক অনেক সহজ এবং তখন এই একটি ছাত্রীই দেখেছি আপাদমস্তক রাজনীতিক। বৈঠকের তারিখ নির্ধারিত হলো ২৯ আগস্ট। কামরুন্নাহার লাইলী জানাল, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আলোচনার কথা তাকে জানিয়েছে তাদের খালেদা আপা। তাদের কাছে যতদূর শুনেছি খালেদা আপার প্রকৃত নাম যুঁইফুল বসু। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা কমরেড খোকা রায়ের স্ত্রী। এই ভদ্রমহিলার নাম আমি বরিশালে শুনেছি। তাঁর বাড়িও এককালে বরিশাল ছিল। তাঁর এক বোন আমাদের দল আরএসপি করত। সেই খালেদা আপাই নাকি কমিউনিস্ট পার্টির মেয়েদের নেতৃত্ব দিতেন। যদিও আজ পর্যন্ত কোনোদিন এ খবর আমি যাচাই করিনি। আমার এ ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহ কম। ছদ্ম নামটি খালেদার পরিবর্তে রাবেয়া হতে পারে।
কিন্তু আমাদের পক্ষে কে আলোচনা করবে? আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে কামরুন্নাহার লাইলী বারবার এ প্রশ্ন নিয়ে এল। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো আমরা কেউ নই, সিদ্দিকুর রহমানই আলোচনা করবেন। তিনি হাসপাতালে থাকলেও অনেকটা সেরে উঠেছেন। তাই কোথাও গেলে পুলিশ তাকে তেমন খোঁজ খবর নেবে না।
এখন তা হলে আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে? আমি লাইলীকে বললাম, সিদ্দিক দু’টি প্রশ্নের জবাব চাইবে। এ দু’টি প্রশ্ন হচ্ছে আরএসপি-কমিউনিস্ট পার্টির পার্থক্যের মূলকথা। (১) আরএসপি মনে করে লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন সঠিক পথ গ্রহণ করেননি। লেনিন কখনো বলেননি যে একটি দেশে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় সম্ভব। কিন্তু স্ট্যালিন ক্ষমতায় এসে লেনিনের এ নীতি পরিহার করেন। অন্যদেশে বিপ্লবের দায়িত্ব না নিয়ে পৃথিবীর কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির লেজুড়ে পরিণত করেন। এক্ষেত্রে ট্রটস্কির নীতির সঙ্গে আরএসপি’র তফাৎ আছে। ট্রটস্কি বিশ্বাস করতেন ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয়ও সম্ভব নয়। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণ শুরু করাও সম্ভব নয়–আরএসপি’র মত হচ্ছে–অন্যদেশে বিপ্লব না করেও সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব।
(২) আরএসপি মনে করে স্ট্যালিনের এই নীতি ত্রিশের দশকে ডিমিট্রিভ তত্ত্বের জন্ম দেয়। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক প্রস্তাবে বলা হয় যে, পৃথিবী তিনভাগে বিভক্ত–১. সোভিয়েত সমাজবাদ, ২. গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ, ৩. ফ্যাসিবাদ। ডিমিট্ৰিভের পপুলার ফ্রন্ট তত্ত্বে বলা হয়েছিল ফ্যাসিবাদকে রুখতে গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঐক্য করা যায়। আরএসপি মনে করে ওই গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঐক্যের নীতিই পরবর্তীকালে সহ-অবস্থানের নীতির জন্ম দেয়। ১৯৪৩ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের চাপে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দেয়।
