সুতরাং ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় কার্জন হলের সংবর্ধনা সভায় আতাউর রহমান এবং আবু হোসেন সরকার উভয়েই গোলাম মোহাম্মদকে মালা দিলেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের জেলে বন্দি হাজার হাজার নেতা ও কর্মী। আমরা আত্মগোপন করে আছি। আর আমাদের নির্বাচিত নেতারা মালা নিয়ে ছুটছেন–কে আগে স্বৈরশাসককে মালা দেবে।
১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। সকলের তখন প্রতীক্ষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কবে দেশে ফিরবেন। তিনি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন কিনা।
আর এদিকে আমার জীবনে ১৯৫৪ সালের জুলাই মাস। অনেক দেনদরবার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ৯৮ টাকা প্রয়োজন। অনেক কষ্ট করে ৪৮ টাকা সংগ্রহ করেছি। বাকি ৫০ টাকার খবর নেই। হাতে মাত্র একদিন। বের হবার উপায় নেই। মনে হচ্ছে পুলিশ আবার সতর্ক হয়েছে। একদিন বন্যার জল দেখতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলাম।
সেবার ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে নৌকা চলত। ভাবলাম কোন এলাকায় কেমন বন্যা হয়েছে তা দেখে আসি। শুনেছিলাম মুন্সীগঞ্জ শহরে নাকি একহাঁটু জল। অনেক কষ্ট করে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে একটি ছোট লঞ্চে মুন্সীগঞ্জ পৌঁছলাম। সত্যি সত্যি মুন্সীগঞ্জে জল আর জল। বেশ কিছুক্ষণ জলের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করলাম। একটু একটু বৃষ্টি পড়ছে। এমন সময় দেখলাম এক ভভদ্রলোক ছাতি মাথায় দিয়ে আমাকে অনুসরণ করছেন। কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে বললেন, আমি বরিশালের লোক। মুন্সীগঞ্জ থানার ওসি। আপনাকে আমি চিনি। এখনই ঢাকায় ফিরে যান। কেন এসেছেন এখানে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে?
আমার আর বন্যা দেখা হলো না। আমি মুন্সীগঞ্জ গিয়েছি তাই কেউ জানে না। তাড়াতাড়ি ফিরতে হলো বৃষ্টির মধ্যেই। ঢাকা ফিরে বুঝলাম বিপদ কাটেনি। সব সময় বাইরে যাওয়া যাবে না। বাইরে না যেতে পারলে টাকা পাব কোথায়। দেশের কোনো লোকই আমার প্রকৃত পরিচয় জানে না। মাসে যা আয় করি তাতে মেসের খাওয়া এবং থাকার ভাড়া হয় না। হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভ্যাস নেই। আর পয়সাও নেই।
এই হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়া নিয়েও কম বিপদে পড়িনি জীবনে। ছোটবেলায় শুনেছি খারাপ ছেলেরা হোটেল রেস্টুরেন্টে খায় এবং আজ্ঞা মারে। ভালো ছেলেদের এটা করণীয় নয়। সুতরাং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে পড়বার প্রথম যুগে আমি কোনোদিন কোনো রেস্টুরেন্টে ঢুকিনি। আড্ডা মারিনি। চা খাইনি। কলকাতায় গিয়ে এই রেস্টুরেন্টে খাওয়া নিয়েই একবার বিপত্তি ঘটল।
আমার সঙ্গে আমার এক বোনের বর। কলকাতায় শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কে গিয়েছি। তিনি বললেন, এখানে রেস্টুরেন্টে ভালো চপকাটলেট আছে। চল রেস্টুরেন্টে খাই। আমি বললাম, ভালো ছেলেরা রেস্টুরেন্টে যায় না বা খায় না। তিনি আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন। একটি চপ কিনে দিলেন। আমার চোখে তখন জল। চোখের জলে আমার খাওয়া হলো না। শুধু ভাবলাম আমি খারাপ হয়ে গেলাম।
সেই আমি ঢাকায় ১৯৫৪ সালে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে বিপদে পড়লাম। শৈশবে শুনেছি ভালো ছেলেরা নেশা করে না। বিড়ি, সিগারেট, চা খায় না। তাই রেস্টুরেন্টে আমাকে নিয়ে গেলে অন্যের বিপদ হয়। মোজাম্মেল দা বলতেন, নির্মল চা খাও। তুমি চা খেলে সস্তায় হয়। চায়ের বদলে অন্য কিছু খেতে অনেক পয়সা প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালে নতুন করে ভালো ছেলে হবার জন্যে চা ছেড়ে দিলাম। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় এসে সস্তায় কিছু খাবার জন্যে আবার চা খাওয়া শুরু করতে হলো।
প্রকৃতপক্ষে নিয়মিত চা খাওয়া ভুলে গিয়েছিলাম। একান্ত দু-একজন পরিচিত ব্যতীত কারো পয়সায় খাওয়া আমার ধাতে সইত না। সেই দিক থেকে নির্ভর ছিলেন একমাত্র নিতাই গাঙ্গুলী। তিনিও অল্প মাইনের চাকুরে।
সেই নিতাই গাঙ্গুলীই দুপুরের দিকে আমার মেসে এলেন। তখন শুয়ে শুয়ে ভাবছি কী করা যায়। আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শেষ তারিখ। নিতাই বাবু বললেন, ব্যাপার কী অনেক দিন দেখা নেই। বললাম, টাকা নেই। আরো ৫০ টাকা প্রয়োজন। কালকে ভর্তির শেষ তারিখ। বললেন, শুয়ে থাকলে কি সমস্যার সমাধান হবে? আমি বললাম, আমি চার্লস ডিকেনস-এর ডেভিড কপারফিল্ডের মিকবার চরিত্র পছন্দ করি। এই বই আমাদের পাঠ্য ছিল ম্যাট্রিকে। মিকবার প্রায় সব সময়ই কপর্দকশূন্য থাকত। বলত একটা কিছু ঘটবেই (সামথিং উইল টার্ন আপ)। আমি সেই একটা কিছু ঘটবার আদর্শে বিশ্বাসী। তাই শুয়ে আছি। করার কিছু নেই।
নিতাই বাবু হাসলেন। পরের দিন ৫০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমি ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসির শেষ পর্বে। মাস খানেক পরে ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) সিট পেয়ে চলে গেলাম। আমার জীবনের আর এক অধ্যায় শুরু হলো।
হলে থেকেও আমার আত্মগোপনের একটি রাস্তা জুটে গেল। আস্তানা ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড। আমাদের দলের সদস্য। পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন দলের প্রথম সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান তখন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের আইএসসি’র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসে ধরা পড়ল তার যক্ষ্মা হয়েছে। তখন ঢাকায় কোনো টিবি হাসপাতাল ছিল না। মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রধান ভবনের চারতলায় টিবি রোগীদের জন্যে একটি ওয়ার্ড ছিল। সিদ্দিকুর রহমান ভর্তি হলেন ওই ওয়ার্ডে। ৫৬ জন রোগী আর আমি। দিনের পর দিন মাসের পর মাস ওই হাসপাতালে গিয়েছি। ডাক্তার লুঙ্কর রহমান আমাকে ধমকাতেন। বলতেন, আপনি মারা পড়বেন। তখন দেখতাম রোগীদের নিকটতম আত্মীয়েরা নাকে রুমাল দিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকত। তারা বুঝত না যে এতে রোগীরা মনে করে আমরা পরিত্যক্ত। নিঃসহায়। আমরা বড় একাকী। আমি কোনোদিন নাকে রুমাল দিয়ে যাইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দক্ষিণের জানালা খুলে বসে বসে গল্প করেছি। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা। ওপারে জিনজিরা দেখেছি। দেখেছি বুড়িগঙ্গায় নৌকা চলা আর স্টিমারের হুল্লোড়। আমি নিশ্চিত ছিলাম এই ওয়ার্ডে পুলিশের লোক আমাকে খুঁজতে আসবে না।
