এই দল ভাঙা শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারির পর। পাকিস্তানের সরকার মুখ্যত আঘাত হানল আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্রী দলের বিরুদ্ধে। বেশি ক্ষত্রিস্ত হলো না হক সাহেবের কৃষক শ্রমিক পার্টি বা মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম। যুক্তফ্রন্টের তখন বেহাল অবস্থা। শেখ সাহেবসহ হাজার কয়েক কর্মী বন্দি। যুক্তফ্রন্টের সরকার তাকে নজরবন্দি করেছেন। আশরাফ উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে যুক্তফ্রন্ট পরিষদ দলের সভা হলো। সিদ্ধান্ত হলো সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ দলে দলে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবেন। তবে সভাও শান্তিতে হলো না। পুলিশ এসে সকলকে চলে যাবার নির্দেশ দিলে সভা ভেঙে গেল। তবুও শেষ চেষ্টা করা হলো। হক সাহেবের কাছে যাওয়া হলো। তিনি এ কর্মসূচিতে রাজি হলেন না। সকলকে এলাকায় গিয়ে বিপ্লবাত্মক কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। তাই যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে আর তেমন কিছু করা হলো না।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ১৬ জুন এক বক্তৃতা দিলেন। হক সাহেবদের দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করলেন। অভিযোগ করলেন হক সাহেব নাকি এ ব্যাপারে স্বীকারোক্তি করেছেন। এরপরে হক সাহেবের বাসায় পুলিশ পাহারা কড়াকড়ি করা হলো। তিনি কিছুতেই কোনো প্রতিবাদ করলেন না। মাওলানা ভাসানী তখন ইউরোপে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ অবস্থায় বিদেশে। হক সাহেব নজরবন্দি। সুতরাং ৯২(ক) ধারার বিরুদ্ধে আন্দোলন তেমন জমল না। জমল ষড়যন্ত্র আর কোন্দল।
দেশে ৯২(ক) ধারা জারি। রাজনীতি সীমিত। আত্মগোপন করে আমার পক্ষে আর রাজনীতি করাও সম্ভব নয়। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমি বিশ্ববিদ্যালয় যাবার পথে কার্জন হলের সামনে বাস থেকে নামতেই কয়েকজন গোয়েন্দা বিভাগের লোক আমার কাছে এল। পালাবার কোনো পথ। ছিল না। তাদের মধ্যে একজন বললেন, আপনার ভয় পাবার কিছু নেই। মনে হয় ভভদ্রলোককে আমি বরিশালে দেখেছি। তিনি বললেন, আপনাকে ধরা হবে না। যে কোনো কারণেই হোক, বরিশাল জেলা গোয়েন্দা বিভাগের দ্বিতীয় কর্মকর্তা (ডিআইও-২) ইউসুফ সাহেব আপনার প্রতি সদয়। তিনি বলেছেন, এ ছেলেটি বারবার ভুগছে। জেলে যাচ্ছে। পরীক্ষা দিতে পারছে না। এবার তাকে ডিস্টার্ব করবে না। তাকে ঢাকায় পড়াশুনা করতে বলো। তার গ্রেফতারি পরোয়ানা বরিশাল থেকে তার নিজের জেলা ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে পাঠিয়ে দেবে। সে যেন বরিশাল না আসে বা বাড়ি না যায়।
কথাগুলো আমার তেমন বিশ্বাস হয়নি। তবে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও স্বস্তি পেলাম। গ্রেফতার না হয়েও চলে এলাম। সেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। আবার বিএসসি পরীক্ষা দেব। রাজনীতি শুরু করব। বরিশাল ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। ঢাকায় ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। আমি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। তখন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলেন আবদুল মতিন তালুকদার এবং সম্পাদক ছিলেন এমএ আউয়াল।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার টাকা কোথায়? ছাত্র পড়ানো নিয়ে একদফা গোলমাল হয়ে গেছে। রাগ করে ছেড়ে দিলাম ছাত্র পড়ানো। ঘটনাটি ঘটেছিল মাইনের টাকা নিয়ে। জীবনে কোনোদিন পড়িয়ে টাকা নিইনি। তাই মাস চলে গেলেও টাকা চাইতে পারিনি। একদিন মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী বললেন, তোমার কি টাকার প্রয়োজন নেই? এই বলে আমার পকেটে টাকা খুঁজে দিলেন। আমি টাকা গুনিনি। মেসে এসে দেখলাম টাকার অংশ নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ আমাকে বেশি টাকা দেয়া হয়েছে না বলে। মাথা টনটন করে উঠল। ভাবলাম, আমাকে কি বকশিশ দেয়া হলো আমাকে না বলে! পরদিন পড়াতে গিয়ে বললাম, আপনাদের টাকা ফিরিয়ে নিন। আমি আর আপনাদের বাসায় পড়াব না। তারা বিস্মিত হলেন।
মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী হোসনে আরা। ড. শহীদুল্লার ভাইয়ের মেয়ে। শিক্ষা জীবনে কংগ্রেসী রাজনীতি করেছেন। কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে মাউন্ট পুলিশ ডিঙিয়ে কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়েছেন। দেশ ভাগ হওয়ার পর ঢাকায় এসেছেন। সারাদিন তিনি সাপ্তাহিক পাকিস্তানের কাজ করেন। ঘর গোছান, ছড়া লেখেন। অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। প্রতি শুক্রবার অর্ধ-সাপ্তাহিক পাকিস্তান বের হবার দিন। চার ছেলে এক মেয়ে নিয়ে কাগজ ভাঁজ করেন। টিকিট লাগান। ডাকে পাঠান। সে এক আশ্চর্য কাণ্ড। সারাদিন বাড়ির সকলে ব্যস্ত।
আমার কথা শুনে বিস্মিত হলেন। বললেন, তুমি ভুল বুঝেছ। তুমি খুব ভালো পড়াও। তোমাকে দ্বিগুণ টাকা দেয়া উচিত। তাই আমি আর সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু টাকা বেশি দিয়েছি। তাতে মনে করার কী আছে। আমার মেজাজ তখন তিরিক্ষি। বললাম, আপনি আমাকে বললেন না কেন? রিকশাওয়ালাকে দশ আনার পরিবর্তে বারো আনা দিলে খুশি হয়, আমি রিকশাওয়ালা নই। এ টাকা আমি নেবো না। এই বলে টাকা রেখে চলে গেলাম।
কিন্তু এরপর কী করবো। মেসের টাকা বাকি পড়েছে। আত্মীয়স্বজন কেউ আমার কথা জানে না। শুনেছি আমি বরিশাল ছাড়বার পর মেজো কাকার ছেলে নাকি এসেছিল বরিশালে আমার খোঁজে। ফিরে চলে গেছে আমাকে না পেয়ে। আমিও তাদের কোনো খোঁজ দিইনি। কারণ বারবার পুলিশ যাবে বাড়িতে। হেনস্তা হবে। যাদের আমি কোনোদিন সাহায্য করতে পারিনি তারা হেনস্তা হোক আমার জন্যে তা আমি চাইনি। কলকাতায়ও চিঠি লিখিনি মা বা ভাইয়ের কাছে। জেলে থাকা পর্যন্ত কলকাতা থেকে ডাকে টাকা আসত। কিন্তু পাসপোর্ট চালু হবার পর সে পথও বন্ধ।
