এর মধ্যে একদিন অনিল চৌধুরী এলেন আমার মেসে। বললেন, তুমি নাকি টিউশনি ছেড়ে দিয়েছ? বললাম, হ্যাঁ। বললেন, এবার কী করবে? তুমি পলাতক খুনের আসামী, এ পরিচয়ে কোথাও আর ছাত্র পড়াতে পারবে কি? যে বাসায় তুমি পড়াতে তারাও তোমাকে চিনে ফেলেছে। তুমি এক বাসায়ই পরিচিত থাকো মামলা থাকা পর্যন্ত। মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী তোমাকে যেতে বলেছেন।
আবার সে বাসায় গেলাম। এবার সমঝোতা হলো আগামী মাস থেকে আমাকে বর্ধিত বেতন দেয়া হবে। আগের মাসে দেয়া বাড়তি টাকা আমি নেব না। মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী দুঃখ পেলেন। বললেন, তোমার বাবা মার মতো আমাদের বয়স। এতে অপমান বোধ করছ কেনো? আমি এবার সব টাকাই নিলাম। দোকানে গিয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে বই কিনে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে দিলাম।
ছাত্রছাত্রী পড়াতে গিয়ে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার বারবার হয়েছে। লক্ষ করেছি প্রতিটি বাসায় প্রাইভেট টিউটর কাজের মানুষের মতোই একজন। এরা বাড়ির কাজের লোকের মতো টাকা নেয়। অথচ চাকর নয়। এরা রক্তের সম্পর্কে অভিভাবক নয়। অথচ উপদেশ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অবস্থানটি টিকিয়ে রাখা কষ্টকর। অনেকে প্রাইভেট টিউশনি করতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে। জল খাবার প্রত্যাশা করে। মাসের পর মাস টাকা না দিলে মুখ ফুটে বলতে পারে না। অনেক বাসায় মেয়ে পড়াতে গেলে দোরগোড়ায় ঝি বসিয়ে রাখা হয়। কখনোবা হঠাৎ করে অভিভাবকদের মধ্যে কেউ এসে মাস্টারের চরিত্রের পরীক্ষা নেয়।
কথাটি আমাকে মোজাম্মেল দা বলেছিলেন প্রথমে। আগেই বলেছি, মোজাম্মেল হক আমাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। এককালে আরএসপি করতেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্পাদক হয়েছিলেন। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলাসেকালের দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তিনি চাননি আমি পাকিস্তানে থাকি। তিনি বলেছিলেন, কী করে থাকবে? বললাম, টিউশনি করব। মোজাম্মেল দা বললেন, তুমি পারবে না, নির্মল। যে সমাজে তুমি মানুষ হয়েছে-মুসলিম সমাজ সেটা নয়। এখানে কোনো বাড়িতে গেলে তোমাকে চাকর দিয়ে চা দেবে। তুমি কোনো চুড়ির শব্দ শুনবে না। তুমি কলকাতায় চলে যাও। আমি বলেছিলাম, মোজাম্মেল দা, আমি পারব। দেখুন না কী হয়।
পরে বুঝেছি আমার মানসিকতা নিয়ে টিউশনি করা মুশকিল। আমি বলতাম–আমি সপ্তাহে প্রতিদিন আসতে পারি। কোনোদিন নাও আসতে পারি। তবে শর্ত হচ্ছে–আমাকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করা যাবে না–আমি কেন গতকাল আসিনি। অনেক বাসায়ই এ শর্তটি মনে রাখতে পারত না। কোনোদিন অনুপস্থিত থাকলে জানতে চাইত, কেনো আগের দিন আসিনি। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই বলতে হতো, কাল থেকে আমি আর পড়াব না। আমি তোমাদের কোনো ফার্ম-এ চাকরি করি না যে কৈফিয়ত দিতে হবে। এভাবে অনেক টিউশনি আমি মাসের মাঝখানে ছেড়ে দিয়েছি। পকেটে পয়সা থাকেনি। মুড়ি খেয়ে দিন কাটিয়েছি ঢাকা শহরে। কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি।
পাকিস্তানের রাজনীতি আবার সেই নির্দিষ্ট বলয়ে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। পাকিস্তান মার্কিন ব্লকের রাষ্ট্র। কমিউনিস্ট বিরোধী শক্ত ঘাঁটি। পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলে কমিউনিস্টরা দেশ দখল করবে। পাশে ধর্ম নিরপেক্ষ জোটনিরপেক্ষ ভারত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে সরকারে। সেই ভারতের পূর্বাঞ্চলে পূর্ব পাকিস্তান। তাই পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকার বহাল থাকা সঠিক নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ ধারণা দিতে পেরেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সাহায্য-সহযোগিতা ছিল।
কিন্তু ইচ্ছে হলেই পূর্ব পাকিস্তানে সে সময় ৯২(ক) ধারা জারি না করে কোনো সরকারের পক্ষে নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়। তাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ায় শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ করলেন।
ঘটনাটি ছিল এমন–পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করলে হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি জীবনে শেষবারের মতো কলকাতা শহরে যান, যে শহরে তাঁর কর্মজীবন কেটেছে যে শহরে তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এখন কোলকাতা আর তার পার্শ্ববর্তী এলাকা পূর্ব পাকিস্তানে উদ্বাস্তুদের ভিড়। হক সাহেব কোলকাতায় গিয়ে বিপুল সংবর্ধনা পেলেন। সংবর্ধনার জবাবে হক সাহেব বললেন, বঙ্গদেশ খণ্ডনের দ্বারা বাঙালিকে, বাঙালি সত্তাকে, বাঙালি স্বকীয়তাকে, বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি মনের কামনাকে দু’টুকরো করা যায় না। যাবেও না। মতলববাজরা দেশটাকে দু’টুকরো করলেও এপার বাংলা, ওপার বাংলার ভাষা ঐ বাংলা ভাষা। মিথ্যার প্রাচীর থাকলেও এপার বাংলা, ওপার বাংলার মানুষ একই ভাষায় কথা বলে। সংস্কৃতিগতভাবে একইভাবে চলাফেরা করে। ইতিহাসের প্রয়োজনে আবার তারা একে অপরের নিকটবর্তী হবে।
কোলকাতায় দি স্টেটসম্যান এ ভাষণের শিরোনাম করল-হক সাহেব আশা করছেন, দু’বাংলার কৃত্রিম প্রাচীর থাকবে না। আনন্দবাজারের শিরোনাম–উভয়বঙ্গের মিথ্যার প্রাচীর ভেঙে ফেলার সংকল্প।
