সঙ্গে অনিল চৌধুরী। দুপুর রোদে গিয়ে হাজির হলাম মোদাব্বের সাহেবের বাসায়। দেখা হতেই জিজ্ঞাসা করলেন-তোমার নাম?
–নির্মল সেন।
নির্মল সেন? তুমি পাঁচ বছর জেলে ছিলে। তুমি খুনের আসামী। তোমার নামে হুলিয়া আছে–ধরে দিলে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে এমন কথা আমি শুনেছি।
মোদাব্বের সাহেব যেনো এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন। অনিল বাবু আমার দিকে বারবার তাকাতে থাকলেন। আমিও অবাক হতে থাকলাম। ভাবলাম এ ভভদ্রলোক এতো কথা জানেন কী করে? বুঝলাম এখানে শিক্ষকতা করা আমার হবে না।
আমি বললাম, সবই সত্যি। তবে পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণার কথা শুনিনি। এবার মোদাব্বের সাহেব ভিন্ন কথা তুললেন। বললেন, তুমি ভয় পেও না। তোমার কাকা ড, ধীরেন্দ্রনাথ সেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান–হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক। তাঁর সঙ্গে আমার কলকাতায় দেখা হয়েছিল। তিনি একবার তোমার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনকে বলতে। নাজিমুদ্দীন-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তোমার কাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি তোমার কথা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে বলতে ভুলে গেছি। আজ হঠাৎ তোমার নাম শুনে সে কথা মনে হলো। কিন্তু আমার প্রশ্ন–তুমি এভাবে ছাত্র পড়াতে এলে কেন? তোমার তো ছাত্র পড়িয়ে বাঁচার কথা নয়।
আমি বললাম, এ প্রশ্ন আপনার করবার কথা নয়। আমি এসেছি এটাই সত্য। মোদাব্বের সাহেব চুপ করে গেলেন। বললেন ঠিক আছে, এখানে পড়াবে। আমি বললাম, থাকার জায়গা নেই? তিনি বললেন, তা হবে না। তবে তোমাকে কথা দিতে পারি আমার বাসায় পড়ালে তুমি জেলে গেলেও আমি সাহায্য করতে পারব।
আমি আর বেশি কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম। হাটখোলা নিতাই বাবুর মেস থেকে চলে এলাম। নাম পাল্টালাম। বনগ্রামে একটি মেসে জায়গা নিলাম। থাকা খাওয়া ৪৫ টাকা। ঐ টাকাও মাসে আয় করতে পারতাম না। বাড়ির লোক জানে না আমি কোথায়। কলকাতায় মা জানেন না আমি কোথায়। তার ধারণা আমার জেলে থাকা অনেক ভালো। তাহলে মা জানতে পারেন আমার স্থায়ী ঠিকানা। চিঠি লিখতে পারেন নিয়মিত।
পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা চলছে। ৯২(ক) ধারার শাসন হচ্ছে প্রেসিডেন্টের শাসন। অর্থাৎ প্রদেশে কোনো মন্ত্রিসভা থাকবে না। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী চার এজেন্ট প্রদেশের গভর্নর আমলাদের নিয়ে শাসন চালাবে। এই আমলাদের দিয়ে শাসন চালু রাখতে হলে প্রয়োজন হবে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের বিশ্বস্ত লোক। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর ও চিফ সেক্রেটারি পাল্টানো হয়। তখন গভর্নর ছিলেন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের অধিবাসী। ভারত বিভাগের সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নার পরিবর্তে ভারতের মুসলিম লীগের সভাপতি হন। ১৫ আগস্ট ভারতীয় গণপরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ভাষণ দেন। তারপর একদিন ভারতীয় মুসলমানদের নেতৃত্ব ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসেন এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক সময় সভাপতি হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি মুখ্যত রাজনীতিক। শোনা যায় এই রাজনীতিক গভর্নর একটি নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি পছন্দ করেননি। পাকিস্তান সরকার যাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারির সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাল্টানো হয়। গভর্নর হয়ে আসেন প্রতিরক্ষা সচিব মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা। একই সঙ্গে চিফ সেক্রেটারি ইসহাক সাহেবকেও পাল্টে দেয়া হয়। তিনিও নাকি নরমপন্থী ছিলেন, পরবর্তীকালে যিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ইসহাক সাহেবের পরিবর্তে চিফ সেক্রেটারি হয়ে এলেন জাঁদরেল আমলা এনএম খান। এনএম খান ইতিপূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে চাকরি করেছেন। সেই সুবাদে অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পরিচিতি ছিলেন। তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্তির অন্যতম কারণ ছিল এক শ্রেণির রাজনীতিবিদের কেনাবেচার চেষ্টা করা।
পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি করলেও প্রাদেশিক পরিষদ বাতিল করেননি। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য তাঁদের সদস্যপদেই আছেন। পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এই সদস্যদের কেনাবেচা করে যদি একটি সরকার গঠন করা যায় এবং সে কাজটিই ইস্কান্দার মীর্জা ও এনএম খান শুরু করলেন পূর্ব পাকিস্তানে এসে। অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তফ্রন্ট ভাঙতে হবে। একটি অনুগত সরকার গঠন করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানে। এ উদ্যোগের পেছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদ।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, পৃথিবীর রাজনীতিতে তখন তিনটি ভাগ। একান্তই স্পষ্ট- (১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেততে পাশ্চাত্যের শিবির, (২) সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির, (৩) যুগোশ্লাভ-ভারতের নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ শিবির। সেকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো নর্থ আটলান্টিক চুক্তিসহ একের পর এক সমাজতান্ত্রিক শিবির বিরোধী জোট গঠন করা হচ্ছিল। অপরপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ওয়ারশ চুক্তি। তৃতীয় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র এই দু’জোটের সঙ্গে না গিয়ে একটি তৃতীয় জোট-জোট নিরপেক্ষ ধারা গঠন করে। পাকিস্তানের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত। ভারতের এই রাজনীতি পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও এই রাজনীতির প্রভাব পড়ে। সেই সময়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নিচ্ছিল। আর সেই সময়ই পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র জয়লাভ করে। বিরাট সংখ্যক নবনির্বাচিত পরিষদ সদস্য পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিবৃতি দেয়। তাই যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কারণ এই এলাকায় পাকিস্তানই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু।
