কিন্তু হরতাল করা কি আদৌ সম্ভব? সিদ্ধান্ত হলো বরিশালের একটি স্কুলে উদ্যোগ নিয়ে দেখা যাক। বরিশাল শহরের ব্রজমোহন স্কুল অর্থাৎ বিএম স্কুলে ছাত্রসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে তখন আব্দুল মান্নান হাওলাদার পড়ত। আবদুল মান্নান হাওলাদার আবদুল মান্নান নামে পরিচিত। প্রথমে আমাদের দল আরএসপি করত। ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হয়। পরে আমাদের ছেড়ে শ্রমিক লীগে যোগ দেয়। দেশ স্বাধীন হবার পর লালবাহিনী গঠন করে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়।
সিদ্ধান্ত হয় ওই স্কুলেই একদিনের ধর্মঘট ডাকতে হবে। আমি একটা ছোটো কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে লিখে পাঠালাম। কাগজটি স্কুলের দেয়ালে সেঁটে দেয়া হলো। ধর্মঘট হলো। বিএম স্কুলে কোনো ঘোষণা ব্যতীতই।
এবার পুলিশ তৎপর হলো। আমার আর বরিশাল থাকা সম্ভব নয়। সে সময়ের একটি মজার ঘটনা এখনো আমার মনে আছে। বিএম স্কুলে ধর্মঘট করতে গিয়ে আমাদের একজন ছাত্রকর্মী তিমির রায় চৌধুরী গ্রেফতার হয়ে গেল। সেদিন কালীপূজা। রাতে অন্য ছেলেরা এসে বলল, তিমিরের মা কালী মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন–এতে লোক মারা যাচ্ছে, নির্মল সেন মারা যাচ্ছে না কোনো। নির্মল সেন মারা গেলে আমার ছেলেটাকে জেলে যেতে হতো না। সেদিন অনেক সঙ্কটের মধ্যেও হাসি পেয়েছিল। তিমিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল সর্বশেষ ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গে। তিমির একটি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। জানি না এখন কোথায় কিভাবে আছে।
আমার তখন মারা যাবার সময় ছিল না। কোথায় যাব? শেষ পর্যন্ত বরিশাল ছাড়বার সিদ্ধান্ত নিলাম। ক’দিন পর বিএসসি পরীক্ষা। এবারে পরীক্ষা দেয়া হবে না। আবার গৌরদী থানার মেদাকুল। মেদাকুল থেকে মাদারীপুর। মাদারীপুর থেকে একদিন লঞ্চে সুরেশ্বর। সুরেশ্বর থেকে। গোয়ালন্দ-নারায়ণগঞ্জের স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা। তখন ১৯৫৪ সালের জুন মাস।
নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ধ্যার দিকে ঢাকায় পৌঁছালাম। শৈশবে ঢাকায় ছিলাম। বাবা ইস্টবেঙ্গল ইন্সটিটিউশনে শিক্ষকতা করতেন। বই লিখতেন। তারপর আবার ঢাকা এলাম দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। বাবা বই লিখতেন বিভিন্ন লাইব্রেরির। ভিন্ন নামে সে বই বিক্রি হতো। আমার মেসো প্রিয়নাথ সেন ছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের অন্যতম মালিক। মামা ছিলেন বাংলাবাজার বইয়ের দোকানের মালিক, শিক্ষক। ঢাকা বোর্ডের বইয়ের একমাত্র সরবরাহকারী। আর এক মেসো ছিলেন উকিল। সে সব বিভাগপূর্ব ১৯৪৭ সালে। দেশ বিভাগের পর যাঁরাও বা ছিলেন তাঁরাও চলে গেছেন ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর। সুতরাং এবার ১৯৫৪ সালে ঢাকায় থাকার সমস্যা প্রকট। পকেটে আট টাকা দশ আনা। চশমার বাট ভেঙে গেছে। দু’টি জামা, দু’টি পাজামা, দুটি লুঙ্গি, দুটি হাফপ্যান্ট সম্বল। উঠলাম দলনেতা অর্থাৎ আরএসপির নেতা নিতাই গাঙ্গুলীর মেসে।
নিতাই গাঙ্গুলী দেশ বিভাগের পূর্বে ঢাকা জেলা আরএসপি’র সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারিদের আন্দোলনের সময় ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতার সঙ্গে। অন্যান্য সকলে মুক্তি পেলেও নিতাই গাঙ্গুলী মুক্তি পেলেন ১৯৫৩ সালে। তাঁকে মুক্তি দিয়ে বলা হলো–আপনাকে আপনার মামাবাড়ি কেরানীগঞ্জ থানার শুভাড্ডায় অন্তরীণ করা হলো। শুভাড্ডায় গিয়ে দেখা গেলো আমাদের ভিটি পর্যন্ত অপরের দখলে। কেউ কোথাও নেই। নিতাই গাঙ্গুলী ঐ নির্দেশ অমান্য করে ঢাকায় থেকে গেলেন। চাকরি পেলেন ঢাকেশ্বরী মিলের সদর দফতর ঢাকায়। এর একটি ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ যুগে বাঙালি মালিকানায় অনেক মিলকারখানা গড়ে উঠেছিল। এরা সেকালের স্বদেশী আন্দোলনে সাহায্য সহযোগিতা করত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অগ্নিযুগের বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতিকে সবদিক থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাই ঢাকেশ্বরী মিলে প্রথমদিকে নিতাই গাঙ্গুলীর চাকরি পেতে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু সে চাকরিও টেকেনি ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হবার পর। ঢাকেশ্বরীর চাকরি ছেড়ে তাকে সংগ্রহ করতে হয়েছিল দৈনিক মিল্লাতে সহ সম্পাদকের চাকরি। ১৯৫৯ সালে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার এড়াতে তিনি দেশান্তরী হন।
হাটখোলা রোডে ঢাকেশ্বরী মিলের প্রধান দফতর ছিল। পাশে ছিল মেস। একদিন সন্ধ্যায় মেসে এসে উঠলাম। নিতাই বাবুর চাকরিও খুব বড়ো চাকরি নয়। তার ওপর কদিন থাকব। আমিই বা কোথায় যাব। খুনের আসামী। দিনে-দুপুরে বের হওয়া মুশকিল।
ঠিক হলো ছাত্র পড়াব। যতদূর লুকিয়ে সম্ভব অন্যত্র থাকব। নাম পাল্টাব। এ ব্যাপারে সাহায্য করলেন মানিকগঞ্জের অনিল চৌধুরী। এককালে কংগ্রেস করে জেল খেটেছেন। অনেক মহলে পরিচিত। তিনি বললেন, এক বাসায় ছাত্র পড়াবার কথা। রাজি হয়ে গেলাম। এর আগে তেমন ছাত্র পড়াইনি। বরিশালে দু’একটি ছাত্র পড়িয়েছি। তাও বেশিদিন নয়। কিন্তু উপায় নেই। কী করা যাবে।
অনিল বাবু বললেন, শিক্ষকতা করতে হলে ইন্টারভিউ দিতে হবে। সেই ইন্টারভিউ দিতে হলো দুপুর বেলা। রিকশায় হুড দিয়ে হাটখোলা থেকে পুরান মোগলটুলিতে মুকুল ফৌজের অফিস। মুকুল ফৌজের পরিচালক মোহাম্মদ মোদাব্বের হোসেন। ওই বাসা থেকে অর্ধসাপ্তাহিক পাকিস্তান নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই বাসায় পড়াতে হলে আমাকে কথা বলতে হবে মোহাম্মদ মোদাব্বের-এর সাথে। মোহাম্মদ মোদাব্বের কলকাতার দৈনিক আজাদের বাঘা বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ঢাকায় মিল্লাতের সম্পাদক ছিলেন। বরিশাল থাকতে তার নাম শুনেছি। স্কুলে পড়াবার সময় তার লেখা ‘সন্ধানী আলো’ বইটি পুরস্কার পেয়েছিল। রাজনীতির দিক থেকে কড়া মুসলিম লীগ হলেও বিশ্বাসের দিক থেকে ছিলেন র্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট অর্থাৎ মানবেন্দ্র রায় (এমএন রায়)-এর অনুসারী। আর আমাদের দল আরএসপি সম্পর্কে তিনি ভালো করেই জানতেন। আরো জানতেন যে, বরিশালে তাঁর মুকুল ফৌজের অনেকেই আমাদের প্রতি অনুরক্ত।
