প্রতিপক্ষ এ সুযোগই খুঁজছিলেন। প্রতিপক্ষ হচ্ছে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার। সামরিক বেসামরিক আমলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন পাকিস্তান সরকারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড প্রভাব। তখন সারাবিশ্বে ঠাণ্ডা যুদ্ধের কাল। এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের শুরু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান জাপান ইতালির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তি অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। এবং জিতেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল একেবারে বিপরীতমুখী। প্রথম মহাযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছিল। পাশ্চাত্যের শাসকবর্গ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের ভয় ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরেও এমন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু জার্মানিকে পরাজিত করা নয়, পরবর্তী সময়ে কমিউনিজম অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব খর্ব করা। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের লক্ষ্য ছিল
সমাজতান্ত্রিক শিবিরে প্রভাব বলয় বৃদ্ধি। এই দুশিবিরের প্রভাব বলয় বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার নামই ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এ যুদ্ধ প্রকাশ্যরূপ নিয়েছিল কোরিয়ায়। এ প্রতিযোগিতায় পৃথিবী তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এই তিনটি ভাগ হচ্ছে (১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিরোধী শিবির; (২) সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির; (৩) যুগোস্লাভিয়া, ভারত, মিসর, ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ শিবির। এই তিন ভাগের প্রথম ভাগের সঙ্গে ছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় ভাগে নিরপেক্ষ ভারত। অপরদিকে কমিউনিস্ট চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের কাছে পাকিস্তান ছিল গুরুত্বপূর্ণ তার ভৌগলিক অবস্থানের জন্যে। এবং অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল তাদের কাছে। তাই পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ হেরে যাওয়ার পর তঙ্কালীন পাকিস্তানের মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না। ভাবখানা যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সকল নীতি নির্ধারক। তবে প্রকৃতপক্ষে অবস্থা তেমনই ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের পরাজয়ের পর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে খান খান করার। এর অন্যতম কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ শরিক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পাকিস্তানকে কমিউনিস্টবিরোধী ঘাঁটি বানাতে। পেশোয়ারে বিমান ঘাঁটি মার্কিন বিমানকে ব্যবহার করতে দেয়া হতো সোভিয়েত ইউনিয়নে গোয়েন্দাবৃত্তি করার জন্যে। আর প্রস্তুতি চলছিল পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের। পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বেই এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। নবনির্বাচিত পরিষদের অধিকাংশ সদস্য এ চুক্তির বিরুদ্ধে স্বাক্ষর অভিযানে সাড়া দেয়। তাই পূর্ব পাকিস্তানের বিজয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়। পূর্ব পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করা তাদের কর্মসূচির অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় কালাহান নামক একজন মার্কিন সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি প্রচার শুরু করেন যে, হক সাহেব দু’বাংলার ঐক্য চান। আর এই ষড়যন্ত্রের অপর এক পর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হওয়ার দিন ১৫ মে আদমজীতে ভয়াবহ বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা হয়। প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে–পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারের অধীনে অবাঙালিরা আদৌ নিরাপদ নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা সংকোচন করতে শুরু করে এবং সদলবলে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে করাচি ডেকে পাঠানো হয়।
অভিযোগ আনা হয় যে, যুক্তফ্রন্ট সরকার দু’বাংলা এক করতে চাচ্ছে। নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কলকাতা গেলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেই সংবর্ধনা সভায় হক সাহেব নাকি এমন কথা বলেছেন, যার অর্থ হচ্ছে, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান। অপমানজনকভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কালাহানকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করায়। হক সাহেবদের বিবৃতি দিতে হয় যে, তারা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা চান না।
কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হক সাহেব ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা ঢাকা ফিরতে ফিরতে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট শাসন জারি হলো। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হলো। গভর্নর হয়ে এলেন ইস্কান্দার মীর্জা ও চিফ সেক্রেটারি হয়ে এলেন এনএম খান। গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার নেতা ও কর্মী।
বরিশালে আমরা কী করব? গ্রেফতার অনিবার্য। এমনই খুনের আসামী এবার পুলিশ কিছুতেই ছাড়বে না। মাত্র কিছুদিন আগে স্কুল-কলেজ খুলেছে। নতুন করে ধর্মঘট ডাকাও কঠিন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আদালতে হাজির হতে পারবো না। জামিন বাতিল হবে। হুলিয়া জারি হবে। বরিশাল থাকা যাবে না। থাকা যাবে না বাড়িতে। অপরদিকে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বা না নিয়ে অন্যান্য দলের সকল নেতারা গা ঢাকা দিয়েছে। ক্ষেপে গেছে ছাত্ররা। তাদের দাবি একটা কিছু করা প্রয়োজন এবং করতে হবে।
