সারা দেশে তখন নির্বাচনী জোয়ার। শেরেবাংলা ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট হক ভাসানী যুক্তফ্রন্ট নামে পরিচিত। এদের সঙ্গে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচারে যোগ দিয়েছেন সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খান। পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩০৯। এর মধ্যে অমুসলমানদের জন্যে ৭২। তারা স্বতন্ত্রভাবেই নির্বাচনে নেমেছে। মুসলিম আসন সংখ্যা ২৩৭। নির্বাচনের সময়কালেই বোঝা গেলো মুসলিম লীগ গো হারা হারবে। যুক্তফ্রন্টের নেতাদের মোকাবেলা করার মতো তাদের কোনো নেতা নেই। শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির পর ৭ বছরের ইতিহাস আছে নির্যাতন ও বঞ্চনার। এই নির্যাতন ও বঞ্চনার প্রতিবাদে প্রণীত হয়েছিল যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা। ঐ ২১ দফায় ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, শহীদমিনার নির্মাণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ছুটি, প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবন বাংলা ভাষা প্রচারের জন্যে ব্যবহারের দাবি নুরুল আমিনের বাসভবন বর্ধমান হাউস এখন বাংলা একাডেমী], দাবি ছিল কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রা ব্যবস্থা রেখে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেবার। এ দাবি সারাদেশে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করল। এর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হলো না কোনো মহলে। তাদের পক্ষে সভা সমাবেশ করাই সম্ভব হলো না।
মেদাকুল থেকে বরিশাল এসে বুঝেছিলাম মুসলিম লীগ হেরে গেছে। আমাদের বেশিদিন আত্মগোপন করে থাকতে হবে না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৮ মার্চ।
নির্বাচনের ফলাফল শুনতে সকল রাস্তায় ভিড়। সকল বাড়িতে এবং দোকানে তখন রেডিও ছিল না। রেডিওয়ালা দোকানের সামনে ভিড় হতো। মাইক্রোফোন লাগিয়ে খবর শোনানো হতো। তখন ভয়েস অব আমেরিকা বা বিবিসি’র তেমন নামধাম ছিল না। উল্লেখযোগ্য ছিল আকাশবাণী।
খবর আসতে থাকল যুক্তফ্রন্টের জয়ী হবার। প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন পরাজিত হলেন ছাত্রলীগের এককালীন সম্পাদক খালেক নওয়াজ খানের কাছে। ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট জিতল ২২৭টি আসনে। ৯ আসন পেল মুসলিম লীগ। পাকিস্তান সৃষ্টির দাবিদার মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির ৭ বছরের মধ্যে পরাজিত হলো শতকরা ৯৭ ভাগ ভোটে। বাকি ৭২ অমুসলমান আসনে যারা জয়ী হলেন তারাও চরম মুসলিম লীগ বিরোধী। ব্যালটে একটি সংসদীয় বিপ্লব হয়ে গেলো সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে।
সকলের ধারণা তখন বাইরে যাওয়া যায়। যুক্তফ্রন্ট জিতেছে। পুলিশ দেখলেও গ্রেফতার করবে না। তেমন বিশ্বাস না হলেও একদিন সন্ধ্যার দিকে বের হলাম। হঠাৎ দেখা হলো এসপি সাহেবের সঙ্গে। বললেন, আপনি খুনের মামলার আসামী। এভাবে বের হলে আমাদের চাকরি থাকে না। আদালতে যান। জামিন পেয়ে যাবেন। অন্যান্য সকলে জামিন পেয়েছেন। বুঝলাম আমার বের হওয়া নিরাপদ নয়। যুক্তফ্রন্ট জিতেছে বলে আমাকে ধরতে পারছে না পুলিশ।
দিন সাতেক পর সিদ্ধান্ত হলো আদালতে আত্মসমর্পণ করব। এতদিনে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। আমাকে জামিন দিতেই হবে। কিন্তু তেমনটি হলো না। আমিসহ দশজন ছাত্র আদালতে হাজির হলাম। আমাদের উকিল সদ্য নির্বাচিত পরিষদ সদস্য এন ডব্লিউ লিয়াকতউল্লাহ এবং অ্যাডভোকেট শমসের আলীসহ অসংখ্য আইনজীবী। ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে ব্যতীত ৯ জনকে জামিন দিলেন। বললেন আমার বিরুদ্ধে খুন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাটের অভিযোগ আছে। আমি বরিশাল নয়, ফরিদপুর জেলার অধিবাসী অর্থাৎ ভিন্ন। জেলার লোক। তাই আমাকে জামিন দেয়া যাবে না।
আমাকে জামিন না দেয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। আদালত প্রাঙ্গণে ছাত্রদের ভিড় জমতে শুরু করল। তাদের থামানো মুশকিল। অবস্থা সামাল দেয়া না হলে হয়তো ভাঙচুর হবে। ছাত্রলীগ নেতারা উকিলদের কাছে বললেন, পরিস্থিতি সামলানো মুশকিল হবে। উকিলেরা হাকিমের সঙ্গে কথা বললেন। এবার আমার জামিন হলো। তবে শর্ত দেয়া হলো শুধু উকিল নয়, নগদ অর্থ জামিন থাকিবে। সেই হাকিম সাহেবের কথা এখনো মনে আছে। তিনি পরবর্তী হাজিরার দিনও আমার জামিন বাতিলের চেষ্টা করেছিলেন। আবার সেই হাকিম সাহেবই দেশে ৯২(ক) ধারা জারি হলে আমার অনুপস্থিতিতে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণে রাজি হননি। আমি তখন পলাতক। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দিয়ে পাকিস্তান সরকার জেলে পুরেছে হাজার হাজার যুক্তফ্রন্টের নেতা ও কর্মীদের।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জামিন পেলাম। ভেবেছিলাম ভালো থাকব। বিএসসি পরীক্ষা জুন মাসে। এবার পরীক্ষা দিতে পারব। এ পরীক্ষা দেবার কথা ছিল ১৯৪৮ সালে। গ্রেফতার হবার কারণে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। আশা ছিল এবার জেল এড়াতে পারব। পরীক্ষা দেবো নিয়মিত। কিছুদিন পর মনে হলো এবারও পরীক্ষা দেয়া হবে না। বিপুল ভোট যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলো। কিন্তু সরকার গঠন নিয়ে একমত হতে পারল না।
ঠিক হলো ২ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত করা হবে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত হলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে শেরেবাংলা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে একমত হলেন না। অনেক বাদানুবাদ হলো। শেষ পর্যন্ত তিনজন সদস্য নিয়ে শেরেবাংলা, প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। অনেক কাঠখড় পোড়ানার পর ১৫ জন সদস্য নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সম্প্রসারিত হলো ১৫ মে।
