এসপি বললেন, তাই হবে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের আমাদের সামনে হাজির করা হবে। আমি মিছিল নিয়ে টাউন হলের দিকে চলে যাবার কথা বললাম। ছাত্র-জনতা কেউই রাজি হলো না। ঘেরাও চলল। ইতিমধ্যে দক্ষিণ দিক থেকে মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের মিছিলের ওপর। সার্কিট হাউসের সামনে তখন নির্মিত হচ্ছিল একটি পেট্রোল পাম্পের ভবন। পড়ে ছিল ইট-কাঠ। জনতার হাতিয়ার হয়ে উঠল এই ইট। দু’পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে এক সময় এসপি মুসলিম লীগের নেতাদের নিয়ে সার্কিট হাউসের পেছন দিক থেকে বের হয়ে চলে গেলেন এ কে স্কুলের মাঠে জনসভা করতে। সে জনসভা ভণ্ডুল হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে সারা শহরে যেন উন্মত্ততা চলছে। শর্ষিনার পীরের মুরিদদের ধরে আনা হচ্ছে। খোঁজা হচ্ছে মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনীকে। এদের ওপর যুক্তফ্রন্টের কর্মিদের প্রচণ্ড রাগ। কারণ ওদের মধ্যেই অনেকে ছিল চেনাজানা। বলেছিল মুসলিম লীগের এতদিনের ভাড়া খাটব, আবার ফিরে আসব। কোনো গোলমাল করব না। অথচ তারাই আমাদের মিছিলে হামলা করেছে লাঠি নিয়ে।
আমি ছাত্রলীগ অফিসে বসা। খবর এল মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনী এ কে স্কুলে স্থান নিয়েছে। যুক্তফ্রন্টের ছেলেরা জিন্দেগী রেস্টুরেন্ট থেকে সুন্দরী কাঠের লাঠি নিয়ে ছুটেছে। আমিও ছুটলাম। জনতা তখন মারমুখী। আমাকে বলছে, আপনি বারণ করতে পারবেন না। ওদের আমরা মেরে ফেলব।
আমি ঠেকাতে পারলাম না। আমরা এ কে স্কুলে ঢুকবার আগেই মুসলিম লীগ বাহিনীর অনেকে পালিয়েছিল। কিন্তু পালাতে পারেনি আব্দুল মালেক। আমার সামনে তার মাথায় ছুঁড়ে দেয়া হলো একটি বিরাট পাথর। মালেক পড়ে গেল। আমি ফিরলাম টাউন হলে। টাউন হলের সামনে তখন হাজার হাজার জনতা। সকল দলের নেতারা বক্তৃতা দিলেন। আমি কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই ঘোষণা করলাম, আমরা পরবর্তী ঘোষণা দেবার পূর্বে বরিশাল জেলার কোনো স্কুল-কলেজ আর খুলবে না।
জনসভা থেকে বের হয়ে আসতেই অন্যান্য দলের বন্ধুরা ধরল। বলল, এ ঘোষণা কেন দিলেন? পদস্থ পুলিশ অফিসাররা এলেন। বললেন, স্কুল-কলেজ কবে খুলবে। কারো কথার জবাব দিলাম না। সেদি’ এ ঘোষণা কেন দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই। বড় ক্লান্ত ছিলাম। ফিরে গেলাম কালীবাড়ি রোডের আস্তানায়। ছাত্র পড়িয়ে থাকি। শুনলাম আহত মালেকের তাপমাত্রা ৯৫ ডিগ্রিতে নেমে গেছে।
২০ জানুয়ারি ১৯৫৪। সারা বরিশাল শহরে একটি অস্থিরতা। সকলের মনে আশঙ্কা। কী হবে। সরকার পক্ষ কালকের ঘটনার বিরুদ্ধে কী ধরনের ভূমিকা নেবে। আহত আব্দুল মালেক বাঁচবে কি না।
বিকালের দিকে ছাত্রলীগ অফিসে এলাম। এ সময় ছাত্রলীগ অফিসের সামনের দেয়ালে প্রতি ঘণ্টার খবর লিখে কাগজে লাগিয়ে দিচ্ছিলাম। দাবি করছিলাম, আব্দুল মালেক আমাদের লোক। কিছুক্ষণ পরে খবর এল মালেক মারা গেছে। সকলেই খানিকটা থমকে গেলাম। অফিসে নামলাম। জানতাম এবার পুলিশ তৎপর হবে।
সে রাতে ইচ্ছে করেই বাসায় থাকলাম। বাড়ির মালিক ধনী ব্যবসায়ী। পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। দুপুর রাতে আমার ঘুম ভাঙানো হলো। বাড়ির মালিকের হাতে থানার এজাহারের অনুলিপি। পুলিশ প্রায় দু’শ জনের বিরুদ্ধে। মামলা দায়ের করেছে বরিশাল সদর থানায়। আমি তিন নম্বর আসামী–এজাহারে লেখা হয়েছে, নির্মল সেন (কমিউনিস্ট)। পিতার নাম নেই। ঠিকানা নেই। এজাহারে বয়ানে লেখা, একজন হিন্দু ছেলে মুসলমানের পোশাকে মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সেদিন আমার পরনে ছিল পাজামা পাঞ্জাবি। আমাকে রাতে বাসা ছাড়তে হলো। রাতে থাকতে হলো বাড়ির মালিকের দোকানের দোতলায়।
কিন্তু কোথায় যাব! স্থির হলো বাড়ির মালিকের গ্রামের বাড়ি গৌরনদী থানার মেদাকুলে যাব। দুদিন পর বরিশালের উত্তরে মহামায়ার মেলা। দুপুরে বোরখা পরে রিকশায় উঠলাম। চারদিকে কাপড়ের ঘের দেয়া রিকশায়। মহামায়ায় গিয়ে বাস ধরলাম। বাস যাচ্ছিল বরিশাল থেকে অধুনা মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার ভুরঘাটা। ভুরঘাটার পথে ইল্লা নেমে হাঁটা পথে মেদাকুল। মেদাকুলে একটি সুবিধা ছিল। যে বাড়িতে থাকতাম সে বাড়ির পাশে খাল। খালের ওপারে ফরিদপুর জেলা। মেদাকুল বরিশাল জেলায়। সুতরাং দু’জেলার পুলিশ এড়ানো সম্ভব ছিল।
কিন্তু গ্রামে দিন কাটানো কঠিন। একদিন গৌরনদীর দারোগা সাহেব এলেন ঐ বাড়িতে আমার সন্ধানে। বাড়ির কর্তা বললেন, আপনার কোনো ভয় নেই। ঐ দারোগা আপনার কক্ষেই ঘুমাবে। আমাদের টাকায় ওদের সংসার চলে। আপনাকে ধরবার মুরোদ নেই। বাড়ির মালিক বড় ব্যবসায়ী। আন্তঃদেশ সুতা ব্যবসায়ী। তাঁকে এড়ানো সেকালের গৌরনদী থানার কোনো দারোগার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এবং তাই-ই হলো। রাতে দারোগা সাহেব আমার কক্ষে ঘুমালেন। তেমন কোনো কথা হলো না। তিনি আমাকে চিনলেন মনে হলো না। ভোরবেলা চলে গেলেন।
আমি বুঝলাম এ বাড়িতে থাকা যাবে না। পুলিশ জেনে ফেলেছে আমি কোথায়। তাই ভাবলাম বরিশাল ফিরব। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। হয়তো সরকার কিছুটা শিথিল করবে বাড়াবাড়ি। ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশাল এলাম। পুরান আস্তানায় জায়গা নিলাম। সকালে বলল–এভাবে থাকলে ধরা পড়বে। আমি বললাম, পুলিশ ভাবতে পারবে না যে আমি পুরান আস্তানায় ফিরে এসেছি। তবে পুলিশ সত্যি সত্যি আমাকে খুঁজেছিল হন্যে হয়ে। মাঝখানে পুলিশ প্রধান বিখ্যাত সামসুদ্দোহা সাহেব বরিশাল সফর করে গেছে। তাই পুলিশ সতর্ক এবং সন্ত্রস্ত।
