কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের কক্ষে কথা শুরু হলো। ভাইস প্রিন্সিপাল দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি (ডিএনসি) আমার স্থানীয় অভিভাবক। তিনি বললেন–নির্মল, তুমি কোনো প্রতিবাদ করো না। তোমার সামনে অনেক বিপদ। গণ্ডগোল করলে পরীক্ষা দেয়া হবে না। আমরা সকলেই চাই তুমি পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে যাও কলেজ থেকে।
আমি বললাম, স্যার লঘু পাপে গুরু দণ্ড হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেরা মেয়েদের দেখলে শিস দেয়। শাড়িতে কালি দেয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়। এই বয়সের এটাই ধর্ম। ছেলেগুলো আমার কাছে এসেছিল। আমি বলেছি, তোমাদের মনে এমন কিছু থাকলে চিঠিপত্র লিখতে পারতে। এভাবে কালি দেয়া ঠিক হয়নি। ওরা আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। ক্ষমাও চেয়েছে। আমি ওই মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করতে বলেছি।
ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, তোমার কথা শুনতে ভালো। কিন্তু প্রিন্সিপাল তোমার কথা মানবেন না। তুমি এ ব্যাপারে নাক গলাবে না। আমি বললাম, তাহলে এ ব্যাপারে আমার অভিযোগ আছে। আমার অভিযোগ হচ্ছে বিজ্ঞানের অনেক শিক্ষকই ঘণ্টার পর ঘন্টা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন। ছাত্ররা ডাকলে কাছেও আসেন না। তাই আমাদের ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে ঐ শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি কিন্তু ছাত্রদের এসব কথা বলব।
ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, তাহলে তোমার এ ব্যাপারে প্রস্তাব কী? আমি বললাম, শুধুমাত্র একটা ওয়ার্নিং। ঐ ছাত্রদের আপনি ডেকে সতর্ক করে দিন যে, ভবিষ্যতে এমন ঘটলে তোমাদের বহিষ্কার করা হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। ছাত্ররা বেঁচে গেল।
যতদূর মনে আছে–এ হচ্ছে ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের কথা। জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ নূরুল আমীন বরিশাল সফরে আসবেন। বরিশাল তখন উত্তপ্ত। এক সন্ধ্যায় মিছিলের সামনে পড়ায় এক মুসলিম লীগ নেতার মুখে থুতু দেয়া হয়েছে। মিছিলে গোন উঠেছে নরুল আমীনকে জুতা মারো। এ পরিস্থিতিতে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সকল দলকে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে ডাকা হলো। কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনিয়নের কথা হচ্ছে নূরুল আমীনের বিরুদ্ধে কঠিন কিছু করা ঠিক হবে না। কোনো খুন জখম হলে এই অজুহাত দেখিয়ে সারা দেশে হয়তো নির্বাচনই বন্ধ করে দেয়া হবে। এ ঝুঁকি আমাদের নেয়া ঠিক হবে না। আমি বললাম, আপনাদের কথা আমি মানতে রাজি আছি। কিন্তু সরকার পক্ষ কিছু ঘটালে ছাত্রলীগ তার প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করবেই। শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হলো।
১৯ জানুয়ারি সকাল থেকেই বরিশাল শহর থমথমে। আমরা তেমন কোনো বিক্ষোভের ব্যবস্থা করিনি। সদর রোডে ছাত্রলীগ অফিসে মাইক থেকে বক্তৃতা দিচ্ছি। নূরুল আমীন সদলবদলে ঢাকা থেকে বরিশালে পৌঁছাবেন স্টিমারে। আমাদের বারণ সত্ত্বেও ডজন খানেক ছাত্র পকেটে কালো রুমাল নিয়ে স্টিমার স্টেশনে যায়। নূরুল আমীন স্টিমার থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গে তারা কালো রুমাল দেখায়। তাদের গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মধ্যে ছিল নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের এককালের সভাপতি আকতার উদ্দিন এবং ছাত্রলীগ নেতা নুরুল ইসলাম মঞ্জুর। এদের গ্রেফতারের খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল শহরে। তখন শর্ষিনার পীরের মুরিদেরা মুসলিম লীগের সমর্থনে মিছিল করেছিল সারা বরিশালে। ছাত্রলীগের অফিস থেকে সব স্কুল এবং কলেজে ধর্মঘটের খবর পাঠানো হলো। খবর এল কলেজে মাত্র একটি ক্লাস হচ্ছে। ঐ কলেজে ধর্মঘটের খবর পাঠানো হলো। ঐ ক্লাসের নেতৃত্বে আছে মুসলিম ছাত্রলীগের ছেলেরা। আমি কলেজে পৌঁছালাম। শিক্ষকরা বললেন, কী করব? পার্সেন্টেজ দিয়ে ছুটি দেব না এমনিই ছুটি দিয়ে দেব? আমি বললাম, পার্সেন্টেজের দরকার নাই। এমনিই ছুটি দিয়ে দেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্বের ক্লাসটিতে ঢুকলাম। ওদের নেতা নুরুল উল্লা (পরবর্তীকালে ইঞ্জিনিয়ার নূরুল উল্লা নামে খ্যাত], যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলের হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন]। নূরুল উল্লার ডাক নাম ছিল ভানু। ভানু আমাকে দেখেই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল।
তারপর শুরু হলো মিছিল। সকলের মুখে এক কথা, নূরুল আমীন কোথায়? তাকে ঘেরাও করতে হবে। ছাত্রদের মুক্তি দিতে হবে। ইতিমধ্যে প্রিন্সিপাল ম্যাক-ই-নানী একটি ভিন্ন পদক্ষেপ নিলেন। তিনি লিখিতভাবে কলেজে জানালেন যে তার কলেজের ছাত্রদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি জেলে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করলেন। জেল কর্তৃপক্ষকে জানালেন ছাত্রদের জেলে রেখে নূরুল আমীনের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজনে তাঁর যোগ দেয়া সম্ভব নয়।
এ খবর ছাত্রদের সাহসী করে তুলল। মিছিল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। জানা গেল নূরুল আমীন সার্কিট হাউসে চলে গেছেন। আমার ইচ্ছা ছিল সংঘর্ষ এড়াবার। চেষ্টা করলাম সার্কিট হাউস এড়িয়ে মিছিল নিয়ে যাবার। কিন্তু সম্ভব হলো না। মিছিল গিয়ে সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলল।
তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ছেলেরা অস্থির হয়ে উঠেছে। পুরো সার্কিট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে আছেন ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, বিভাগীয় কমিশনার জিএম ফারুকী এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী খান আব্দুল কাইউম খান। নূরুল আমীন সার্কিট হাউসের ভেতরে, এমন সময় এসপি আমাকে ডেকে পাঠালেন, বললেন কী চান? আমি বললাম গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বললেন, ছেড়ে দেয়া হবে। আমি বললাম, তাদের ছেড়ে দেয়া নয়, এখানে এনে দেখাতে হবে। তাহলে মিছিল চলে যাবে।
