তখন ব্রজমোহন কলেজে সরাসরি ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাধারণ সম্পাদক বা সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হতো না। নির্বাচনী কলেজ প্রতিনিধি গঠিত হতো প্রতিটি শ্রেণির প্রতিনিধি নিয়ে। বিভিন্ন শ্রেণির জন্যে বিভিন্ন পদ নির্ধারিত থাকত। নির্বাচিত কলেজ প্রতিনিধি ঐ তিনটি পদে নির্বাচন করত। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো কলেজ মিলনায়তন কালী প্রসন্ন হলে, অর্থাৎ কেপি হলে।
আমি নির্বাচন হলে ঢোকামাত্র আমাদের পক্ষে একজন আমার নাম ভিপি হিসেবে প্রস্তাব করল। অন্য দু’জনের নামও প্রস্তাবিত হলো। ভিপি প্রার্থী ছিল তিনজন–আমি, কলেজিয়েট ফ্রন্টের অন্যতম প্রার্থী হাবিবুল্লাহ ও মুসলিম ছাত্র সংঘের আব্দুল বারী। নাম প্রস্তাবিত হবার সঙ্গে সঙ্গে অধ্যক্ষ উঠে দাঁড়ালেন, বললেন–নির্মল সেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কারণ সে ভর্তির সময় মুচলেকা দিয়েছিল যে কলেজে রাজনীতি করবে না।
আমি উঠে বললাম, আপনি ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন। এমন কোনো মুচলেকা আমি দিইনি। আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আদৌ রাজনীতিও নয়। এবার অধ্যক্ষ বললেন, আমি সংসদের প্রধান হিসেবে তার প্রার্থীপদ বাতিল করলাম। আমি তখন আমাদের সমর্থকদের কলেজিয়েট ফ্রন্টের প্রার্থী হাবিবুল্লাহকে ভোট দেবার জন্যে বললাম। অধ্যক্ষ বললেন, তুমি কাউকে সমর্থন করতে পারবে না। তোমার সদস্যপদ বাতিল। আমি বললাম, তাহলে অধ্যক্ষ হিসেবে আপনি নিরপেক্ষ নন। আপনাকেও আমার সাথে কক্ষের বাইরে যেতে হবে। দীর্ঘদেহী ব্রিটিশ আইসিএস এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানী আমার সঙ্গে কক্ষ থেকে বের হলেন। কিছুক্ষণ পরে নির্বাচনের ফল বের হলো। আমাদের সমর্থিত তিনজন প্রার্থীই জিতে গেল। অধ্যক্ষ বললেন, নির্মল সেন একজন গুণ্ডা। পরদিন তিনি আমার স্থানীয় অভিভাবক অধ্যাপক দেবেন চ্যাটার্জিকে বললেন-নির্মলকে টেস্ট দিয়ে চলে যেতে বলুন–আমি ওকে আটকাব না।
ইতিমধ্যে নির্বাচনী গোলমাল শুরু হলো। আমি খুনের মামলায় জড়িয়ে। গেলাম। খুন হলো তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের বরিশাল সফর নিয়ে।
১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হয়ে বরিশাল ছেড়েছিলাম। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বরিশালে এলাম ১৯৫৩ সালে। ১৯৪৮ সালে জেলে যাবার ফলে বিএসসি পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ভেবেছিলাম বিএসসি পরীক্ষাটা শেষ করব। তাই বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আবার ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার হয়তো হুড়-হাঙ্গামা হবে না। কিন্তু ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা হলো। নতুন করে হাঙ্গামা শুরু হলো। মনে হচ্ছিল সেবারও পরীক্ষা দেয়া হবে না।
জেলখানা থেকে ফিরে বরিশালে এক ভিন্ন চিত্র দেখলাম। এককালের বরিশালের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টি, আরএসপি এই দুটি বামপন্থী দলের প্রভাব ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর নির্যাতনের ফলে দুটি দলই বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে এ দুটি দলের মৌলিক পার্থক্য ছিল। পার্থক্য ছিল জাতীয় রাজনীতি নিয়েও। কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান সমর্থন করেছিল। আরএসপি সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম বাংলার আন্দোলনে নেমেছিল। পাকিস্তান আমলে আরএসপি ও কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্ব ও চিন্তার দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও সরকারি নির্যাতনের ফলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেরই চেষ্টা করা হতো।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে রুখবার জন্যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। এই যুক্তফ্রন্টে ছিল আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল। প্রথম দিকে আরএসপি এই নেতৃত্বের সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীকালে সকল বামপন্থী দলই যুক্তফ্রন্টকে সমর্থন দেয়। ১৯৫৩ সালে আরএসপি পুনর্গঠিত হয়। এই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন রুহুল আমিন কায়সার, নিতাই গাঙ্গুলী ও এবিএম মূসা। এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কাজ করা শুরু করি এবং বরিশালে আমি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই।
১৯৫৪ সাল। নির্বাচন এগিয়ে আসছে। বরিশালে নির্বাচনী সফরে আসবেন পূর্ব পাকিস্তানের তক্কালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব নূরুল আমীন। সঙ্গে আসবেন উত্তর প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আব্দুল কাইয়ুম খান। বরিশালের ছাত্রদের সিদ্ধান্ত-এ সফর ঠেকাতে হবে।
আমি তখন কলেজ নিয়ে বিব্রত। কলেজ নির্বাচন নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ইতিমধ্যে আর এক কাণ্ড ঘটিয়েছে আইএসসির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্ররা। তারা একদিন পড়ন্ত বেলায় পদার্থবিদ্যার ক্লাসের আগে ছুটি দেবার জন্যে শিক্ষকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু ক্লাসের শিক্ষক রাজি হননি। তখন তিনজন ছাত্র কলম থেকে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে সামনে বসা ছাত্রীদের শাড়িতে। ছাত্রীরা চিৎকার করে উঠলে ক্লাস ছুটি হয়ে যায়। অভিযোগ চলে যায় অধ্যক্ষের কাছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, তিনজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কারের। তবে এ নির্দেশ কার্যকর করার পূর্বে ভাইস প্রিন্সিপালকে বললেন–আমার মতামত জানার জন্যে। আমি তখন কলেজে যাই না। টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে গেছি। তবুও অধ্যক্ষের আশঙ্কা এ ছাত্রদের বহিষ্কার করা হলে আমি হয়তো কলেজে গণ্ডগোল করব। তাই আমাকে ডেকে পাঠানো হলো কলেজে।
