আমি কলেজে ভর্তি হবার পর প্রিন্সিপালের আচরণ পাল্টে গেল। তিনি আমাদের ক্লাসের কাছাকাছি আসতেন। দেখতেন, আমি ক্লাসে আছি কি না। কোনো ছাত্র আমার সঙ্গে কলেজ প্রাঙ্গণে কথা বললে তিনি ডেকে পাঠাতেন। বলতেন–Do not spoil yourself he is a maxist (নিজেকে নষ্ট করো না–ঐ ছেলে মার্কসবাদী)। বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের ডেকে বলতেন, সাবধান, ওর সঙ্গে ঘুরলে বৃত্তি কাটা যাবে। অর্থাৎ প্রিন্সিপালের জন্যেই কলেজে আমি আমার অজান্তে ভয়ের বস্তুতে পরিণত হলাম।
এই রাজনীতি নিয়ে একটি ঘটনা আছে ম্যাক-ই-নানীর আমলে ব্রজমোহন কলেজে। ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিন মারা যান। ছাত্র সংঘের পক্ষ থেকে কলেজ ছুটি ঘোষণা দাবি জানানো হলে তিনি উচ্চকণ্ঠে হেসে দিলেন-দ্য ক্যান্সার ইজ আউট। তিনি ছুটি দিতে রাজি হলেন না। পরদিন কলেজ ধর্মঘট। ফলে ছাত্র সংসদের সঙ্গে প্রিন্সিপালের বিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি ভিপিসহ ছাত্র সংসদের সদস্যদের বহিষ্কার করেন। এ সময় আমি কলেজে ভর্তি হই।
তবে আমার তখন রাজনৈতিক তেমন পরিচিতি ছিল না ছাত্রদের মধ্যে। ছাত্র সংসদ ছিল ছাত্র ইউনিয়নের দখলে। ছাত্রলীগ দুর্বল। এ সময় আমাদের দল ছাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছাত্রলীগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। সাধারণ সম্পাদক হন হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গোলাম রাব্বানী। কলেজের রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে।
অপরদিকে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ঘোষিত হয়। ঘোষণা করা হয় ৫৪ সালের প্রথম দিকে পূর্ব বাংলায় সাধারণ নির্বাচন হবে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পর এটাই ছিল প্রথম সাধারণ নির্বাচন। সুতরাং রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এ সময় ঘোষণা হয়, ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে।
১৯৫৪ সাল। পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন। এর আগে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া হলো। বিরোধী দলের পক্ষে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলো। নাম–কলিজিয়েট ফ্রন্ট। টিকল না। আমি ভিপি প্রার্থী কলিজিয়েট ফ্রন্ট থেকে।
এ নির্বাচন নিয়ে একটি ঘটনা ঘটল। এ নির্বাচন আমার মনে তখন বেশ দাগ কেটেছিল। নির্বাচনের পূর্বদিন রাতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁরা বললেন, সামনে সাধারণ নির্বাচন ব্রজমোহন কলেজে আমাদের জিততে হবে। না হলে সাধারণ নির্বাচনে তার ছাপ পড়বে। তা ছাড়া ব্রজমোহন কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মাত্র ২০০ হিন্দু ছাত্র। আপনি দাঁড়ালে নির্বাচনে জেতা যাবে না। আপনি সরে দাঁড়ান।
তাদের বক্তব্য আমার অযৌক্তিক মনে হয়নি। তবে খারাপ লেগেছিল হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নটি উত্থাপন করায়। সব সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখেছি কমিউনিস্ট পার্টি বরাবরই সাধারণ মানুষকে শ্রেণি ভিত্তিতে না দেখে সম্প্রদায় হিসেবে দেখেছেন। এ হিসেবে পাকিস্তান সমর্থন করেছে। মুসলিম লীগের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল কমরেড’ খুঁজেছে। এবারও তাদের মুখ্য যুক্তি হচ্ছে আপনি হিন্দু–তাই আপনার দাঁড়ানো ঠিক হবে না।
আমি রাজি হলাম না। ভাবলাম এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে চিন্তার রাজনীতি সঠিক নয়। আমি পরাজিত হতে রাজি। তবে হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে নয়। সুতরাং নির্বাচন হবে আগামীকাল এবং আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।
তবে সরকার সেভাবে ভাবেনি। আমাদের ভাবনার বাইরে একটি সিদ্ধান্ত ছিল সরকারে। সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করলেন ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ। নির্বাচনের দিন দুপুরের দিকে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন তাঁর কক্ষে। ইতোমধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে আমাকে দাঁড়াতে দেয়া হবে না। অধ্যক্ষ শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে আগেই তাঁর কথা বলেছেন। অধ্যক্ষের শঙ্কা হচ্ছে, আমি নির্বাচিত হলে শ্লোগান উঠবে-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক।’ আমি দাবি করব বহিষ্কৃত ছাত্রদের ফিরিয়ে নেয়া হোক। সুতরাং আমাকে দাঁড়াতে দেয়া হবে না। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাহলে নির্মল সেনের মনোনয়নপত্র কেন গ্রহণ করা হয়েছিল? কোন ভিত্তিতে? তখনই বলা উচিত ছিল যে তুমি দাঁড়াতে পারবে না। জবাবে অধ্যক্ষ বলেছিলেন–তিনি নাকি ধারণাই করতে পারেননি যে, আমি নির্বাচিত হব। ভেবেছিলেন আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ক্ষতি নেই। কারণ আমি পরাজিত হবই। সেদিন নাকি তাঁর ধারণা হয়েছে আমি জিতে যাব। সুতরাং তার সিদ্ধান্ত, আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই দেয়া হবে না। এ ক্ষমতা নাকি ছাত্র সংসদের প্রধান হিসেবে তার আছে। তিনি শিক্ষকদের আশ্বাস দিলেন যে কলেজে হাঙ্গামা এড়াবার জন্যে এ পথ নেয়া হচ্ছে এবং আমার নির্বাচনের জন্যে কোনো টাকা ব্যয় হয়ে থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে দিয়ে দেবে।
আমি এ খবর পেয়েই অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকলাম। ঢোকামাত্র অধ্যক্ষ ম্যাক ই-নানী বললেন–তুমি কলেজে গণ্ডগোল করছ। তোমার ছেলেরা সন্ত্রাস করছে। আমি বললাম, আপনি মিথ্যা বলছেন। কলেজে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। অধ্যক্ষ বললেন, তোমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেয়া হবে না।
আমি বললাম, কেনো?
তিনি বললেন, আমার ইচ্ছে। তুমি নির্বাচিত হয়ে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ বলবে। বহিষ্কৃত ছাত্রদের কলেজে ফিরিয়ে নিতে বলবে। কলেজে গোলমাল হবে। আমি বললাম, আমাকে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে না দেবার আপনি কে? তিনি বললেন, আই অ্যাম দি কনস্টিটিউশন-আমি ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র। আমি বললাম, আমি আপনার নির্দেশ মানি না। আমি বললাম, আমি নির্বাচন করব। আপনি পারলে ঠেকাবেন। আপনার সঙ্গে নির্বাচনের কক্ষে দেখা হবে। আমি অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলাম।
