ঐ দুই গোয়েন্দা সাথে নিয়ে আমি আবার বের হলাম। এবার হাঁটছি ফুলবাড়িয়া স্টেশনের দিকে। কোথায় যাব ঠিক জানি না। স্টেশনের কাছে পৌঁছাতে দূর থেকে দেখি খালেক দা আসছেন। খালেক দা আমাকে দেখে অবাক হলেন। বললেন, তুমি কোথা থেকে এলে! কখন মুক্তি পেলে? কোথায় থাকছ? কোথায় খাচ্ছ? আমি তখন নির্বাক। আদৌ ভাবিনি খালেক দা’র সাথে আমার রাস্তায় দেখা হবে। বললাম, আপনাদের খুঁজছিলাম। শামসুদ্দিন দা’র কাছ থেকে এলাম।
খালেক দা গোয়েন্দাদের বিদায় নিতে বললেন। বললেন, তুমি আমার সাথে চলো। বললেন, চলো বংশাল রোডে। ওখানে মোজাম্মেল আছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় চাকরি করে। যতদূর মনে আছে দৈনিকটির নাম ‘আমার দেশ’। সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ। আমাকে দেখে মোজাম্মেল দা যেন চিৎকার করে উঠলেন। আমার হাতে তখন বাড়ি যাবার একটা স্টিমার টিকেট। তিনি টিকেটটি নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। বললেন, তোমার বাড়ি যাওয়া হবে না। তুমি কিছুদিন ঢাকা থাকবে। তোমার জন্য পাসপোর্ট করতে হবে। কলকাতায় গিয়ে তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। কলকাতায় তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি খুব দুঃখ করছিলেন–তোমাকে ফেলে কেন আমরা সবাই ভারতে চলে এলাম। মোজাম্মেল দা বললেন, কলকাতায় যাওয়া তোমার প্রথম কাজ। তারপর তুমি কোটালীপাড়া যাবে।
আমি সেই পড়ন্ত বেলায় মোজাম্মেল দা’র মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এই সেই মোজাম্মেল দা। ১৯৪৭ সালে আমি বরিশাল বিএম কলেজে পড়ি। তিনি আমাদের নেতা। দেশ বিভাগের পর মা চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গে। আমি বরিশালে, জানতেন তিনি। আমি মোজাম্মেল দা’কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কী করব। তিনি বললেন, তোমার যাওয়া হবে না। তুমি রাজনীতি করবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২। ঢাকা বংশাল রোডের একটি অফিসে আমি মোজাম্মেল দা’র সামনে দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, মোজাম্মেল দা, আমার একটি কথা আছে। ১৯৪৭ সালে আপনি বলেছিলেন, তোমার দেশ ছেড়ে যাওয়া হবে না। এবার আমি বলছি–আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি আগে কোটালীপাড়া যাব। আপনি পাসপোর্ট-ভিসার চেষ্টা করতে পারেন। পাসপোর্ট ভিসা পেলে আমি যাব মাকে দেখতে।
মোজাম্মেল দা আমার পাসপোর্টের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে আমি পাসপোর্ট পেয়েছিলাম দুই মাসের জন্য। সে পাসপোর্ট আমার হাতে আসতে আসতে দুই মাস কেটে গেছে। এরপর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আমাকে কোনো পাসপোর্ট দেয়নি।
মোজাম্মেল দা আমার কা শুনে বললেন, ঠিক আছে। চলো, পাতলাখান লেনে যাই। পাতলাখান লেনে গাফফার আছে। অর্থাৎ আবদুল গাফফার চৌধুরী। যতদূর মনে পড়ে গাফফার দোতলায় থাকত। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
১৯৪৮ সালে বিএসসি প্ৰীক্ষার্থী ছিলাম। ১৯৫৩ সালে আবার চেষ্টা করছি ঐ বিএসসি পড়বার। দুটি সেশন চলে গেছে, তাই নতুন অনুমতি নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেলখানায় বিজ্ঞান পড়া যায় না। তাই জেলার দিনগুলো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায় কোনো কাজে আসেনি।
কিন্তু আমার জন্যে তদ্বির করবে কে? বরিশাল এসে দেখলাম পুরনো বন্ধু তেমন কেউ নেই। দলের অন্যতম নেতা সুধীর সেন জেলখানায়। বরিশাল শহরে অসংখ্য চেনাজানা লোক আছে। রাজনৈতিক দলের সদস্য আছে। কিন্তু থাকব কোথায়। শেষ পর্যন্ত ঐ দেবেন দা অর্থাৎ দেবেন ঘোষের বাসায়ই উঠতে হলো। ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানীর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কমিটির সদস্য। ক্যাথলিক চার্চের লোক। বাড়ি আয়ারল্যান্ড। আইসিএল। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময় নোয়াখালীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বর্ষায় ব্রিটিশের পক্ষে গোয়েন্দাগিরিও করেছেন।
একটি বিশেষ লক্ষ্যে তাঁকে ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ করা হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের জন্যে তখন ঢাকার বাইরের ৩টি কলেজ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই তিনটি কলেজ হলো– বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং রংপুরের কারমাইকেল কলেজ। পাকিস্তান সরকার এ কলেজগুলোতে প্রাক্তন সিভিল সার্ভেন্টদের নিযুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সুবাদে ব্রজমোহন কলেজে আসেন ম্যাক-ই-নানী।
এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানী আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করলেন। বললেন, তিনি ঢাকা গিয়ে আমার জন্যে তদ্বির করবেন। তদ্বিরের জন্যে আমিও ঢাকা গেলাম। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ভগ্নিপতি আব্দুল হামিদ তালুকদার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। তাঁর কাছে গেলাম গাফফারকে নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত আবার ব্রজমোহন কলেজে পড়বার অনুমতি মিলল। দেবেন দা একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন বরিশালে এক বাসায় পড়াবার বিনিময়ে। বিপদ দেখা দিল ভর্তি নিয়ে। পাকিস্তান আমলে কড়া নিয়ম ছিল। মুচলেকা দিতে হতো যে রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করব না এবং সে জন্য প্রয়োজন হতো একজন স্থানীয় অভিভাবকের।
বরিশাল শহরে কে আমার স্থানীয় অভিভাবক হবেন? আমি জেলখানা থেকে এসেছি। সরকারের সুনজরে নেই। কেউ রাজি হবেন না আমার স্থানীয় অভিভাবক হতে। এবার সহযোগিতা করলেন জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর। তিনি জাহাঙ্গীর হোসেন নামে পরিচিত। ছাত্র জীবনে আরএসপি করতেন। তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক দিক থেকে বরিশালে বেশ প্রভাব ছিল। তিনি আমাকে ব্রজমোহন কলেজের তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি ডিএনসি নামে পরিচিত। ইংরেজির অধ্যাপক ডিএনসি আমার স্থানীয় অভিভাবক হলেন। ১৯৫৩ সালের জুলাইতে আমি পুনরায় ব্রজমোহন কলেজে বিএসসি শেষ বর্ষের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলাম। সামনে পরীক্ষা।
