হেমেন দাস রোডে স্বদেশ বাবুর সাথে দেখা হলো। তিনি খুব খুশি হলেন বলে মনে হলো না। কারণ তখন সারা দেশে ভয়ের রাজত্ব। মুসলিম লীগের ত্রাসের শেষ ছিল না। বিশেষ করে হিন্দু ছিল ভীষণভাবে শঙ্কিত। তারপর আমি রাজবন্দি এবং ধর্মের বিচারে মুসলমান নই।
স্বদেশ বাবু খুব দুঃখ সুলেন। বললেন, এখানে থাকো। চেষ্টা করে দেখো কোনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা যায় কিনা। তোমার বাড়ি যাবার একটা ব্যবস্থা হবেই। তবে একবার শামসুদ্দিনের কাছে যাও। শামসুদ্দিন রেডিওতে চাকরি করে। ঢাকা জেলের কাছেই রেডিও অফিস। শামসুদ্দিন তোমাকে নিশ্চয়ই খবর দিতে পারবে।
বিকেলের দিকে আমি রেডিও অফিসে গেলাম। আমার সাথে গোয়েন্দা বাহিনীর দু’জন লোক। ওরা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। আমার নাম করে অফিসে স্লিপ পাঠালাম। শামসুদ্দিন দা যেন কেমন হয়ে গেলেন। বললেন, তুই কোথায় থেকে এলি? কোথায় ছিলি এতদিন? আমার যেন মনে হলো শামসুদ্দিন দা কোনো খবরই রাখেন না।
শামসুদ্দিন দা’র সাথে দেখা হয়নি দীর্ঘদিন। তার সাথে পরিচয় বরিশালে ছাত্রজীবনে। তিনি তখন আরএসপি’র ছাত্র ফ্রন্টের অন্যতম নেতা। কবিতা লেখেন। গল্প লেখেন। শামসুদ্দিন দা তখন বিশেষ আকর্ষণ। ছাত্রজীবনেই তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘শাহেব-বানু’ প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন ছোটদের জন্য উপন্যাস ‘কাকলী মুখর। মুসলিম লীগের তখন প্রচণ্ড প্রতাপ। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন না। তিনি নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের অন্যতম নেতা। শামসুদ্দিন দা ছিলেন আমাদের কাছে একটি গল্প।
দেশভাগের আগে শামসুদ্দিন দা ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। যতদূর মনে আছে তিনি এমএ পড়ার জন্য কলকাতা যান। পাকিস্তান সৃষ্টি হবার সময় শামসুদ্দিন দা বললেন–তিনি পাকিস্তানে থাকবেন না। তাঁর কথায় পাকিস্তান হবে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। ঐ রাষ্ট্রে তিনি থাকবেন না। তাই চলে গেলেন কলকাতায়। ১৯৪৮ সালের ২৯ মার্চ আমি কলকাতা যাই একটি পরিবারকে পৌঁছে দিতে। কলকাতা গিয়ে শামসুদ্দিন দা’র খোঁজ নিলাম। তিনি থাকেন পার্ক সার্কাসের কংগ্রেস একজিবিশন রো-তে। তাকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লোয়ার সার্কুলার রোডে আরএসপি’র রাজ্য দফতরে গেলাম। তখন সেখানে থাকতেন ড. অরবিন্দ পোদ্দার। তখন ‘ক্রান্তি’ নামে আরএসপির একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ড. নীহার রায় ও ত্রিদিব চৌধুরী। তবে পত্রিকাটির সব কাজ চালাতেন ড, অরবিন্দ পোদ্দার। অরবিন্দ পোদ্দারকে জিজ্ঞেস করলাম শামসুদ্দিন দা’র কথা। তিনি বললেন, আপনার দাদা এখন বড্ড ব্যস্ত। খুব লেখালেখি করছেন। তাঁকে। এখন খুঁজে পাওয়া ভার। শামসুদ্দিন দা’র সাথে দেখা না করেই বরিশাল ফিলাম। তার কয়েক মাস পর গ্রেফতার হলাম। এই দীর্ঘদিন তেমন খবর রাখিনি। শুনেছিলাম শামসুদ্দিন দা পূর্ববাংলায় ফিরে রেডিওতে কাজ নিয়েছেন। আর তাঁকে নিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের বিতর্ক চলছে শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে।
তবে এ বিতর্কের জন্মসূত্র রাজনীতি। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে মতানৈক্য ছিল আরএসপি’র। এ ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা দুঃখজনকভাবে অসহনশীল। আরএসপি’র কাউকে তারা সহ্য করতে পারতেন না। আরএসপিকে কোণঠাসা করতে মুসলিম লীগ, পরবর্তীকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপের সাথেও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আবার কমিউনিস্ট বন্ধুদের কথায় তারাই একমাত্র সাচ্চা সমাজতন্ত্রী। যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধিতা করবে তারা নিশ্চয়ই মার্কিনপন্থী। আরএসপি অন্ধভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতি অনুসরণের পক্ষপাতি ছিল না এবং এই মৌলিক পার্থক্যের জন্যই আরএসপি’র জন্ম হয়েছিল। সুতরাং আরএসপিকে ঠেকানো ছিল যেন কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুদের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। তার চরম শিকার হতে হয়েছিল শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও আবদুল গাফফার চৌধুরীকে।
এই দুজনের সাথে আমি সব প্রশ্নে একমত ছিলাম, তাও নয়। কিন্তু এদেশে ডিগবাজির ইতিহাসও কম নয়। যারা পাকিস্তান আমলে আদমজী পুরস্কার পাবার জন্য দৌড়-ঝাঁপ করেছেন, পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে তকমা পেয়ে গলায় ঝুলিয়ে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছেন তারা কিন্তু আজো প্রগতিবাদী। তাঁরা সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালি। কিন্তু আজো আবদুল গাফফার চৌধুরী কোনো নিবন্ধ লিখলে সাত রকমের প্রশ্ন ওঠে। আমার প্রগতিবাদী বন্ধুরা বলেন, ধ্যাৎ! গাফফার চৌধুরী তো সারাজীবনই দালালি করেছে। একে নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। আমি গাফফার চৌধুরীর পক্ষে কিছু বলছি না। গাফফারকে যারা প্রতিদিন গালি দেন তাদের বলব-বন্ধুরা, একটু নিজেদের অতীত স্মরণ করুন। একবার হলেও আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে নিজেদের অতীতের কথা চিন্তা করুন। এমনকি ‘৭১ সালেও আপনারা সকলে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন তার প্রমাণ কিন্তু মিলছে না।
শামসুদ্দিন দা’র কথায় তেমন ঘাবড়ে গেলাম না। জানতাম, তিনি খুব অসুবিধায় আছেন। প্রথমে মনে হয়েছিল জেলখানা থেকে বের হয়ে গোয়েন্দা নিয়ে সরাসরি রেডিও পাকিস্তানে যাওয়া ঠিক হবে কি না। শামসুদ্দিন দা বিপদে পড়বেন কি না। তবুও আমার উপায় ছিল না। তাই বন্ধুদের খোঁজ-খবর করতে শামসুদ্দিন দা’র কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কারো ঠিকানা দিতে পারছিলেন না। নিজের দাদার ঠিকানা দিলেন। বললেন, কাল ভোরে আমার বাসায় আসবি। তোর সাথে অনেক কথা আছে।
