ঠিক এই সময় একদিন দুপুরের দিকে আমাকে জেল অফিসে ডাকা হলো। ভাবলাম নিশ্চয়ই অন্য জেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই শরীর খারাপ। অন্য জেলে গেলে ঢোকাই মুশকিল হবে। ঢাকা জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমি কোনোদিন প্রিয়ভাজন ছিলাম না। আমার সাথে বাঙালি, বিহারি সকল জেল পুলিশেরই ভালো সম্পর্ক ছিল। জেলের খবরাখবর ছিল আমার নখদর্পণে। বাইরের খবর আদান-প্রদান করতে পারতাম অতি সহজেই। তাই ভয় ছিল হয়তো আমাকে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। জেল গেটে নিয়ে ঠিক এমন কথাই আমাকে বলা হয়। বলা হলো–এত খবর আপনি রাখেন কী করে? তবে আপনাকে অন্য জেলে পাঠানো হচ্ছে না। বলা হলো, অন্য জেলে বদলি নয়–আপনার মুক্তির নির্দেশ এসেছে। আমি চমকে গেলাম। আমি এখন কোথায় যাব?
জেল গেটে ডেপুটি জেলার বললেন, আপনি রিলিজড। রিলিজ? আমি জিজ্ঞাসা করলাম, নিঃশর্ত? নইলে কিন্তু আমি জেলের বাইরে যাব না। ডেপুটি জেলার জামান সাহেব (বৃহত্তর ফরিদপুরের এ যাবতকালীন সর্বকনিষ্ঠ ডেপুটি জেলার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কারাগারসমূহের মহাধ্যক্ষ হয়েছিলেন) হাসলেন। বললেন, এবার আপনার নিঃশর্ত মুক্তি। কিন্তু কত টাকা চান? কত টাকা আপনার বাড়ি যেতে লাগবে? পাঁচ টাকা, দশ টাকা, পনের টাকা।
ডেপুটি জেলারের কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বললাম, এক পয়সাও না। আপনার মতো অনেক ডেপুটি জেলার আমাদের বাড়িতে থেকে মানুষ হয়েছে। তাই আপনার বুঝবার কথা নয়, আমার কত টাকা প্রয়োজন হবে।
পরিবেশ খারাপ হতে থাকলে হস্তক্ষেপ করলেন একজন পুলিশ অফিসার। তাকে আমি চিনি না। তিনি বললেন, ডেপুটি জেলার সাহেব, নির্মল সেনকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। তিনি অসুস্থ। তিনি কোথায় যাবেন কেউ জানে না। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। পড়েছেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। রাজনৈতিক অনেক বন্ধু আছেন ঢাকায়। উচ্চ মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে আমাদেরকে বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছে। বলে দেয়া হয়েছে–যেখানে তিনি যেতে চান সেখানে তাঁকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে ঢাকায় এসে আমাদের রিপোর্ট করতে হবে। তাই সব দায়িত্ব আমাদের। এমনকি তিনি দেশান্তরী হতে চাইলেও সে ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে।
পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির হাত থেকে বের হলাম বেলা দুটার দিকে। সবকিছুই তখন নতুন মনে হচ্ছে। প্রথম ঢাকা এসেছিলাম ১৯৩৯ সালে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবার পর বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার ঢাকা এসেছিলাম ১৯৪৮ সালের ময়মনসিংহ সম্মেলনে যাবার পথে। সেটা ছিল জানুয়ারি মাস। ১৯৪৮ সালের অক্টোবরেই ঢাকা জেলে এলাম রাজবন্দি হিসেবে। এই ৪ বছরে ঢাকা জেল থেকে মাত্র একবার বের হয়েছি। ডাক্তার দেখাতে অনেক পুলিশ দিয়ে আমাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তারপর আর বাইরের বোদ দেখার সুযোগ হয়নি।
১৯৫২ সালের শেষে মুক্তি পেয়ে মনে হলো আমি কোথায় যাব? ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর দল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাইরে কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জানি না। শুনেছিলাম মোজাম্মেল দা কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে আরএসপি’র মুখপত্র দৈনিক গণবার্তার প্রধান বার্তা পরিবেশক হয়েছিলেন। শুনেছি পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগেই তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। ঢাকার একটি সংবাদপত্রে কাজ করছেন। খালেক দাও নাকি ঢাকায়। তিনিও নাকি সংবাদপত্রে কাজ করেন। দলের অন্যতম নেতা শ্রমিক নেতা নেপাল সাহা দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। মুক্তি পেয়ে কোথায় আছেন জানি না। শুনেছি রুহুল আমীন কায়সার অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেছেন। শুনেছি আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকায় আছেন। ঢাকা বেতারে কাজ করছেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। যিনি শামসুদ্দিন আবুল কালাম নামে পরিচিত।
আমার এক মামা ছিলেন মালিটোলায়। বাংলাবাজারে বইয়ের দোকান ছিল। শিক্ষকতা করতেন প্রিয়নাথ স্কুলে (বর্তমান নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে)। তিনি এককভাবে ঢাকা বোর্ডের বই সরবরাহ করতেন। ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় তিনি সব কিছু হারিয়েছেন। সবকিছু হারিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। এক মেসোমশাইর বাসা ছিল গোয়ালনগরে। তিনি লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের অন্যতম মালিক ছিলেন। তিনিও দেশান্তরী দেশ বিভাগের পর।
জেলখানার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম আমি কোথায় যাব। বাড়িতে কে আছে তাও জানি না। মা দেশান্তরী হয়েছে অনেকদিন আগে। দেশে তিন কাকা আছেন। একজন কোটালীপাড়ায়। অপর দু’জন টুঙ্গীপাড়ার পাটগাতীতে। শুনেছি ছোট কাকা পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগেই চলে গেছেন ভারতে। এছাড়া ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে হলেও অনেক ঝামেলা। স্টিমারে বরিশাল। বরিশাল থেকে খুলনাগামী স্টিমারে পাটগাতী স্টেশনে নামতে হবে। তারপর ঘণ্টা তিনেক নৌকায়। সে পথের কী হাল তাও জানি না।
হঠাৎ মনে এল ঢাকার মোহন দাস রোডের কথা। যতদূর মনে ছিল হেমেন দাস রোডে অগ্নিযুগের বিপ্লবী স্বদেশ নাগের একটি বাড়ি আছে। স্বদেশ নাগ এককালে আরএসপি করতেন। পরবর্তীকালে জয়প্রকাশের সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন। সে যুগের বিপ্লবীরা ঢাকা এলে স্বদেশ নাগের বাড়িতেই থাকতেন। এখানে উঠতেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, ধীরেন দত্ত, ফণী মজুমদার এবং দেবেন ঘোষ প্রমুখ। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হেমেন দাস রোডেই যাব।
