যে ছাত্রটি তখন প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেনি, তখন কিন্তু সে খ্যাতি অর্জন করেছিল ছাত্রনেতা হিসাবে। পূর্ববাংলায় ৯টি জেলায় তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ হলো ঢাকা জেলায়। তাই জেলখানায় আসতে হলো। তার কথায়, লেখাপড়া করার তেমন ইচ্ছা তার ছিল না। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের তকালীন চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ সাহেব নাকি তাকে উৎসাহিত করেছেন লেখাপড়ার জন্য এবং কথা দিয়েছেন বোর্ডের অনুমতি তাকে দেয়া হবে। তার বইপত্র সবই সংগ্রহ করে দেয়া হলো। সেই প্রতিশ্রুতিতেই তার পরীক্ষা দেবার বাসনা।
তবে এই সামসুদ্দিন সাহেব কিংবা আউয়াল সাহেব কেউই দীর্ঘদিন জেলখানায় থাকেননি। কেউ এসেছেন। কেউ গিয়েছেন। শুধুমাত্র আমরা কিছু লোক জেলখানায় রয়ে গেছি বছরের পর বছর।
জেলখানায় আউয়াল সাহেবের সাথে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। আমি তখন আরএসপি’র ছাত্র ফ্রন্ট, পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশনের সদস্য। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব বাংলার নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের নাম পাল্টানা হয়। পাল্টিয়ে করা হয় পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন। আউয়ালের প্রস্তাব ছিল এক সাথে ছাত্রলীগ করবার। আমি বললাম ছাত্রলীগ সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আউয়াল বলল–কালক্রমে এই সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম’ শব্দ তুলে দেয়া হবে। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অপেক্ষায় ছিল কাউন্সিল অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের। কিন্তু এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এসে যায়। তাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্র আন্দোলনের একটি নতুন ঘটনা ঘটে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। এই সংগঠনের উদ্যোক্তারা জানান, দেশে কোনো অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান না থাকায় ভাষা আন্দোলনের আলোকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্য ইতিহাসের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ ইতিপূর্বেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ অসাম্প্রদায়িক হবার ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে এ কথাও সত্য যে, যারা এককালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন তাঁদের অনেক নেতাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের নেতৃত্ব দিলেন। সুতং প্রশ্নটি নীতিগত বা আদর্শগত নয়। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ফ্রন্টছাত্র ফেডারেশনের নামে তখন কাজ করতে পারছিল না। তাই এককভাবে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে একটি ছাত্রফ্রন্ট প্রয়োজন। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের হাতে চলে গিয়েছে। এই পটভূমিতেই ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হয়। যারা বলেন, একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের তাগিদেই ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল তারা জেনেশুনে বা অজ্ঞতাবশত এই ব্যাখ্যা দেন।
যদিও এ ঘটনা আমি অনেক পরে জেনেছি। এমএ আউয়ালের কথা এল বলে প্রাসঙ্গিকভাবে এ কথাগুলো উল্লেখ করলাম। ১৯৫৩ সালে আমাদের দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ছাত্রলীগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিই। সে কাহিনিও অনেক দীর্ঘ।
এমএ আউয়াল দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন না। সামসুদ্দিন আহমেদও তাড়াতাড়ি মুক্তি পেয়ে যান। ভাষা আন্দোলনের সময় আউয়ালের নামে আবার হুলিয়া জারি করা হয়। ভাষা আন্দোলনে আউয়াল গ্রেফতার হয়েছিল কিনা মনে নেই। তবে জেলখানায় তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা জেলে এসেছিলেন আস্তে আস্তে ‘ সবাই ছাড়া পেতে থাকেন। তখন জেলখানায় আমার শরীর খুবই খারাপ। সিভিল সার্জন লিখলেন, এই রাজবন্দিকে বাইরে ছেড়ে দেয়া না হলে বেশিদিন বাঁচবে না। সুতরাং তাকে মুক্তি দেয়া যায়।
আমার মুক্তির জন্য তদ্বির করছিলেন দেবেন দা। অর্থাৎ বরিশালের দেবেন ঘোষ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি কুমিল্লার ধীরেন দত্তের সাথে আলোচনা করেন আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে। একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে দেখা করেন পূর্ববাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের সাথে। নূরুল আমীন সিভিল সার্জনকে রিপোর্ট দিতে বলেন এবং রিপোর্টের ভিত্তিতেই আমার মুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। ভাবতাম, যতদিন পাকিস্তান আছে ততদিন জেলে থাকতে হবে। তখন ঢাকা জেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন নাসির উদ্দিন সরকার। খ্যাতনামা চিকিৎসক। তিনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। একদিন তিনি বললেন, এদেশে আপনার কোনো চিকিৎসা হবে না। মুক্তি পেয়ে কলকাতায় যান। হয়তো কলকাতার ট্রপিক্যাল মেডিসিন হাসপাতালে আপনার চিকিৎসা হতে পারে। কিন্তু ডাক্তার সাহেব জানতেন না, আমি মুক্তি পেলেই কলকাতায় যেতে পারব তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তখন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাসপোর্ট-ভিসা চালু হয়েছে। পাকিস্তান সরকার এ কাজটি করেছেন ভাষা আন্দোলনের পর। পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগে যে কেউ যখন খুশি ভারত যেতে পারত। ভারত থেকে পাকিস্তান আসতে পারত। পাকিস্তান সরকারের সন্দেহ হলো এই অবাধ যাতায়াতের সুযোগ নিয়ে ওপার থেকে দুস্কৃতিকারীরা আসছে। তারাই আন্দোলনে ইন্ধন যোগাচ্ছে। দৈনিক মর্নিং নিউজ খবর ছাপাল, নারায়ণগঞ্জে হাজার হাজার ধুতিপরা হিন্দু ভাষা আন্দোলনের পক্ষে মিছিল করছে। সুতরাং অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে হবে। কিন্তু কাজটি সহজ হলো না। তখন ভারত থেকে আসা অসংখ্য চাকরিজীবী পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরও বাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। তারা হুমকি দিলো পাসপোর্ট-ভিসা চালু হলে দল বেঁধে তারা ভারতে চলে যাবে। এবার নূরুল আমীন ভিন্ন প্রস্তাব দিলেন। বললেন, আপাতত পাসপোর্ট-ভিসা চালু হচ্ছে না। পরবর্তীকালে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। কিন্তু রাজি হলেন না পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধান রায়। তিনি পাসপোর্ট ও ভিসা চালুর পক্ষে নন। তিনি বললেন, তবে এ নিয়ে বারবার বিতর্ক করা যাবে না। পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে হলে এখনি করতে হবে। নইলে কোনোদিনই নয়। পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে বাধ্য হলো।
