এই চার বছরে অনেকের সাথে দেখা হয়েছে জেলে। চট্টগ্রামের অমল সেন, আব্দুস সাত্তার, অনঙ্গ সেন, হাসি দত্ত, কালীপদ চক্রবর্তী। কুমিল্লার চন্দ্রশেখর দাশগুপ্ত, ইয়াকুব মিঞা, এবাদত উল্লাহ, ফরিদ খান, কান্তি সেন, সত্য ঘোষাল, অমূল্যকাঞ্চন দত্ত রায়, নরেশ চক্রবর্তী। ময়মনসিংহের আলী নেওয়াজ খান, সিরাজুল ইসলাম, সুধীন দত্ত রায়, প্রফুল্ল সেন, সতীশ সাহা, মাধব সান্যাল, আলতাফ আলী, জমির আলী, হাসি বসু, অজয় রায়। ঢাকার ধরনী রায়, রণেশ দাশগুপ্ত, শৈলেন রায়, তকিউল্লাহ, নাসির, মুনির চৌধুরী, নাদেরা বেগম, ইরা চৌধুরী, বিনয় বসু, আব্দুর রহমান মাস্টার, জিতেন ঘোষ, সিরাজুল হক। বরিশালের নরেন্দ্রনাথ রায়, নুটু ব্যানার্জি, অবনী সরকার, কাশী ব্যানার্জি, অজিত বসু, প্রশান্ত দাশগুপ্ত। এ ধরনের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন জনের সাথে ঢাকা জেলে দেখা হয়েছে। কখনো একসাথে থেকেছি। কখনো ভিন্নভাবে থেকেছি। এছাড়াও থেকেছি ফরিদপুরের সমরেন্দ্র নাথ সিংহ ও প্রফুল্ল রায়, মুন্সিগঞ্জের শফিউদ্দিন আহমদ ও খুলনার আনোয়ার হোসেনের সাথে।
২. যাদের সাথে জেলে ছিলাম
যাদের সাথে জেলে ছিলাম তাদের মধ্যে তিনজনের সাথে এক সময় নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে একজন আনোয়ার। গরীবের ছেলে। দৌলতপুর কলেজের ছাত্র। আমাদের সাথে বেশ কিছুদিন ছিল ঢাকা জেলে। মুক্তি পেয়ে চলে যায় খুলনায়। আবার গ্রেফতার হয়। ১৯৫০ সালে ২৪ জানুয়ারি রাজশাহী জেলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। আনোয়ার মারা যায়।
১৯৪৯ সালে আরো দু’জন রাজবন্দি আসে আমাদের এলাকায়। একজন মুন্সিগঞ্জের সামসুদ্দিন আহমেদ। অপরজন এমএ আউয়াল। পরবর্তীকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইত্তেফাকের সহকারি সম্পাদক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর আদমজী জুট মিলের প্রশাসক হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদে।
রাজনীতিতে সামসুদ্দিন আহমেদের জীবন বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি এককালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। আবার ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির এক ধরনের কৌশল। তাদের কৌশল ছিল অন্যান্যদের প্রতিষ্ঠান দখল করা। যে প্রচেষ্টা তারা করেছে পাকিস্তান আমলে। ন্যাপ ও আওয়ামী লীগে নিজস্ব লোক ঢুকিয়ে দিয়েছে। লক্ষ করা গেছে, এ কৌশল কাজে আসেনি। এ কৌশল ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার জর্জ ডিমিট্টভের পপুলার ফ্রন্ট তত্তের পরিণতি।
এই উপমহাদেশে এই তত্ত্বের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যারা কংগ্রেস বা মুসলিম লীগে ঢুকেছিল তারা কেউ আর নিজ দলে ফিরে আসতে পারেনি। নিজ দলে ফিরে এসেও শেষ রক্ষা হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টির যে সদস্য একালে আওয়ামী লীগ, ভাসানী ন্যাপ বা মোজাফফর ন্যাপে ঢুকেছে তারাই সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে।
সামসুদ্দিনের ক্ষেত্রে প্রায় তেমনটি ঘটেছিল। ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক হিসেবে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো তরফের আস্থা অর্জন করতে পারেননি।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর সামসুদ্দিন আহমেদ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সব আন্দোলনেই তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এক সময় তিনি দলের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সন্দেহ হয় যে, সামসুদ্দিন আহমেদ পুলিশের এজেন্ট হয়ে গেছেন। সুতরাং তাঁকে এড়াতে হবে। সার্কুলার চলে গেল দলের সব সদস্যদের কাছে। সামসুদ্দিনের ছোট ভাই সফিউদ্দিন আহমেদ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। সেও সার্কুলার পেল। আর দুই ভাই এক সাথে জেলে এল আমাদের ওয়ার্ডে।
আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নই। ফলে সামসুদ্দিন আহমেদের আড্ডা হলো আমার এলাকায়। বড় দুঃখ করতেন তিনি। পার্টির জন্য তিনি জিন্নাহর সাথে টক্কর ধরেছেন। সকলের বিরাগভাজন হয়েছেন। সেই পার্টিই এখন তাকে বিশ্বাস করে না। এক গভীর বিক্ষোভ ছিল সামসুদ্দিন আহমেদের মনে। শেষ পর্যন্ত সামসুদ্দিন আহমেদের অবস্থান হলো আবার সেই মুসিলম লীগের সাথে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এককালের মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের সাথে পাকিস্তান চলে গেছেন। পাকিস্তানের নূরুল আমীন ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। সামসুদ্দিন আহমেদ ছিলেন তার একান্ত সচিব। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকা এসেছিলেন। আমার সাথে আর দেখা হয়নি।
১৯৪৯ সাল। দেখলাম ঢাকা জেলে আমাদের ওয়ার্ডে এক তরুণ এল জেল পুলিশের সাথে। তার সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষার অনেক বইপত্র। শুনলাম তরুণের নাম এমএ আউয়াল। ভাবলাম এই বয়সে ভভদ্রলোক প্রবেশিকা পরীক্ষা দিচ্ছেন–ব্যাপারটি কী!
এমএ আউয়ালের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানার আশ্বিনপুর। শৈশবে তার বাবা মারা যান। চলে যান কলকাতায়। কলকাতায় খিদিরপুর ডক এলাকায় তাঁর পরিচয় হয় ড, মালেকের সাথে। সেখানে তিনি শ্রমিক রাজনীতি শুরু করেন এবং শুরু করেন লেখালেখি। আমি পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথমদিকে এমএ আউয়ালের লেখা পড়েছি। আরএসপির সাপ্তাহিক গণবার্তায় ও কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক স্বাধীনতায়। সেকালে এই দলগুলো মুসলিম ছেলেদের নিয়ে খুব টানা-হেঁচড়া করত। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোতে তখন মুসলমান ছেলেদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে এদের দলে টানার একটা উদ্যোগ ছিল সকল দলে। সেভাবেই এমএ আউয়াল গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিলেন। প্রবেশিকার চৌকাঠ পার হয়েই।
