এরপরে আছে সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষা। প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্যে কিছুই করা যায়নি। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকদের জন্যে দ্বিতীয় বেতন বোর্ড কাঠামো হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। পাকিস্তান থাকলে এতদিনে বেতন বোর্ডের রোয়েদাদ প্রকাশিত হতো। সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা বাড়ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠিত হয়েছিল। কোনো বাজেট আসছে না। সরকার এগোচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে সকল পত্রিকা বন্ধ হবে। দেশে একদলীয় রাজনীতি হবে। হাতেগোনা কয়েকটি পত্র-পত্রিকা থাকবে। এ সংবাদে সাংবাদিক মহলে নানা শঙ্কা।
সাংবাদিকদের বাসস্থানের সমস্যা আছে। পাকিস্তান আমল থেকে এ দায়িত্বে আমি ছিলাম। এখন দেশ স্বাধীন। সকলের ধারণা আমি ইউনিয়নের সভাপতি না হলে অনেক কিছু পাওয়া যেত। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি তর্ক করি। কোনো ব্যাপারে কারো কথা শুনি না। তাই সরকার আমার উপর খুশি নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সরকারের সাথে মতান্তর চলছেই।
১৯৭৪ সালে নিউজপ্রিন্ট নিয়ন্ত্রণ আইন জারি হলো। সংসদে লবণ নিয়ে বিতর্ক রিপোর্ট করতে গিয়ে চাকরি হারাল দু’জন সাংবাদিক। সব নিয়েই ইউনিয়নকে লড়তে হচ্ছে। আর প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমাকে বিতর্কে নামতে হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটলো পাবনায়। আমার এক বন্ধুর শ্যালকের বিয়ে। নাম গোবিন্দ দত্ত। ঢাকা থেকে বিমানে ঈশ্বরদী হয়ে পাবনা পৌঁছালাম। দুপুরের দিকে একটি গুলির শব্দ শুনলাম। কৌতূহল হলো। শুনলাম পাবনায় ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে একটি রিজার্ভ হাউস আছে। এই রিজার্ভ হাউসে নাকি যে কোনো লোককে ডেকে এনে যখন তখন হত্যা করা যায়। আমাকে আরো বলা হলো–দীর্ঘদিন ধরে পাবনার আদালতে নাকি কোনো বিচার বসছে না। বিচারকরা শঙ্কিত। তাদের নাকি কোনো বিচারের কাজ করতে দেয়া হয় না। জেলা ছাত্রলীগের নির্দেশে রায় দিতে হয়।
একথা শুনে আমি খানিকটা অবাক হলাম। মনে হলো এ আমি কোন দেশে আছি। একটি জেলা শহরে যে কোনো সময় যে কাউকে ডেকে এনে গুলি করা যায়। আদালতে বিচারক বসে না। অথচ দেশে একটি সরকার আছে। সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে কোনো কথা বলে না। অর্থাৎ ওই শহরে বিরাজ করছে একমাত্র ভয়, শঙ্কা আর সন্ত্রাস। এ ব্যাপারে আমি নিজেই কিছুটা খবর নেবার চেষ্টা করলাম। চেষ্টা করলাম মহকুমা হাকিমের সাথে দেখা করতে। তার দফতরে ঢুকেই আমার আক্কেল গুড়ুম। আমি তাঁর দফতরের বাইরে বসা। ভেতরে তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। কথা বলছেন, আটঘরিয়া থানার একটি অভিযান নিয়ে। ওই থানা নাকি জাসদের ঘাঁটি। সেই থানা অভিযান নিয়ে বিস্তারিত কথা শুনলাম। কিছুক্ষণ পর মহকুমা হাকিমের সঙ্গে কথা হলো। আমি কথা না বাড়িয়ে ঢাকায় ফিরে এলাম। দৈনিক বাংলায় উপ-সম্পাদকীয় লিখলাম। যতদূর মনে আছে শিরোনাম ছিল পাবনায় একটি রিজার্ভ হাউস। আমার লেখার পরে মনে হলো সকলের ভয় ভাঙল। সাম্যবাদী দলের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বিবৃতি দিলেন সংবাদপত্রে। সরকারি মহলেও কিছুটা প্রতিক্রিয়া হলো। শুনেছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কথা তুলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছিলেন, আমার সাথে নয়, নির্মল সেনের সাথে কথা বলো। আমার সঙ্গে কেউ কোনোদিন কথা বলেনি।
তবে আমার লেখার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল পাবনায়। আমার লেখায় ক্ষুব্ধ হয় ছাত্রলীগ। আমাকে তারা প্রেস ক্লাবে খুঁজতে যায়। সেখানে না পেয়ে গোবিন্দ দত্তের বাড়িতে চড়াও হয়। গোবিন্দ ওরফে রণজিৎ দত্ত পাবনা শহরে তখন দুটি রেশন দোকানের মালিক। শুনেছি আমাকে আশ্রয় দেওয়ার খেসারত হিসেবে তাকে একটি রেশন দোকানের মালিকানা ছেড়ে দিতে হয়। পরবর্তীকালে রণজিৎ দত্ত দেশান্তরী হন। কয়েক বছর আগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই ১৯৭৪ সালেই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। খুন-ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তরা বাদে ৭১-এর অপরাধীদের মুক্তিদানের নির্দেশ দেয়া হয়। আমি আগেই উল্লেখ করেছি এই ক্ষমা ঘোষণার খবরটি তকালীন রাষ্ট্রপতিও জানতেন না। সেদিন বিকালের দিকে বঙ্গভবন থেকে দৈনিক বাংলায় ফোন করে এ খবরের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়।
আমার সেদিন অদ্ভুত লাগছিল। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে আমি শ্রেণি বিভাগ করে ৭১-এর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছিলাম। আমি লিখেছিলাম এই অপরাধীদের মধ্যে চিহ্নিতদের ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো হোক। অন্যদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আমি সব কিছুই লিখেছিলাম পূর্ব জার্মানির অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল নিয়ে আমি পূর্ব ইউরোপে যাই। আমার সফরের প্রথম দেশ ছিল পূর্ব জার্মান। অর্থাৎ সেকালের কমিউনিস্ট জার্মান। আমি কমিউনিস্ট নেতাদের কাছ থেকে জার্মান যুদ্ধবন্দিদের খবরাখবর নিয়েছিলাম এবং যেখানে তারা নাৎসী যুদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল সেই ব্যবস্থার কথাই সুপারিশ করেছিলাম বাংলাদেশে। কিন্তু কেউই আমার কথা মেনে নেয়নি। তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বিভিন্ন মহলে। দৈনিক বাংলার বাণীতে লেখা হয়েছিল–সরকারি পত্রিকায় চাকরি করে এত সাহস আমি কোথায় পাই? মুক্তিযুদ্ধের ১৮ মাস না কাটতেই আমি কী করে ৭১-এর অপরাধীদের মুক্তির কথা বলতে পারি? এ নিয়ে পরবর্তীকালে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে।
