কোটালীপাড়া কলেজের একটি ইতিহাস আছে। ষাটের দশকের শেষ দিকে ঢাকায় আমরা কয়েক বন্ধু কোটালীপাড়ায় একটি কলেজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এর মধ্যে আমি ছাড়া অ্যাডভোকেট শরাফত চৌধুরী, অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান এবং প্রতিষ্ঠার পুরোভাগে ছিলেন অ্যাডভোকেট কাজী হারুনার রশিদ। যিনি মুংও কাজী নামে পরিচিত। টাকা, ধান, চাল ও জমি দিয়ে এলাকার মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় আলোচনা হয়েছিল কলেজের নাম নিয়ে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এই কলেজের নাম রাখার প্রস্তাব হয়েছিল। কিন্তু সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কোনো ব্যক্তির নামে নয়, কোটালীপাড়ার নামে এই কলেজের নামকরণ করা হবে এবং এই নামেই কলেজ স্বীকৃতি পায়।
সবকিছু পাল্টে গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। যারা কলেজের প্রতিষ্ঠার সময় কাছাকাছি ছিল না তারা কোন জাদুবলে সব কিছু করার এখতিয়ার পেয়ে গেল। আমার মনে হয় শুধুমাত্র তঙ্কালীন প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্যেই প্রধানমন্ত্রীর পিতার নামে কলেজের নামকরণ করল। আমাদের মতামত নেয়ার প্রয়োজনও অনুভব করল না। আর এ ঘটনার পরে অধ্যক্ষ আমার কাছে এলেন কলেজে মুজিববাদ পড়াবার জন্যে বিভাগ খুলবার কথা শোনাতে। আমার সেদিন ঘৃণা হয়েছিল শিক্ষক নামক এই প্রাণিটির জন্যে। চামচাগিরি করে নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্যে শিক্ষিত বলে কথিত এই প্রাণিগুলো যে কত নিচে নামতে পারে, এই ভভদ্রলোক ছিলেন তার অন্যতম উদাহরণ।
আমি ভভদ্রলোককে বিদায় দিয়ে গণভবনে গেলাম। তখন গণভবনে ছিল আমার অবারিত দ্বার। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের কলেজের নাম পাল্টাল কেন। তিনি বললেন, আপনাদের কথা আমি জানব কী করে। আমি বললাম, আপনি না জানলে এ কাজ হতে পারে না। আপনি জানেন, আমরা কারো নামে কলেজ করতে রাজি হইনি। পাকিস্তান আমলে আপনাদের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল কোনো ব্যক্তির নামে কলেজ হবে না। অথচ আপনারা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই সে পরিস্থিতি পাল্টে গেল। আমরা বরাবরই একটি নির্দিষ্ট অর্থে কোনো ব্যক্তির নামে কলেজ করতে রাজি হইনি। সে ব্যাখ্যা আপনি জানেন। আদর্শ কলেজ হতে হলে আদর্শ ব্যক্তির প্রয়োজন। আমাদের দেশে আদর্শ ব্যক্তির খুব অভাব। এ কথা ভেবেই আমরা কোটালীপাড়া কলেজ নামকরণ করেছিলাম। এ কথা জেনে আপনিও কিছু বলেননি। ঠিক আছে–আপনারা যদি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, কলেজের নাম পরিবর্তন করবেনই, তাহলে প্রয়োজনীয় টাকাটা আপনাদের সংগ্রহ করতে হবে। কারণ কলেজের নাম পাল্টাতে হলে বিরাট অংকের টাকা দিতে হয়।
আমার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী গম্ভীর হয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে বললেন, কলেজের নাম যারা পাল্টিয়েছে এই টাকা তারাই দেবে। আমি দিতে যাব কেন? আমাদের কথা সেখানেই শেষ হয়ে গেল। ইচ্ছে ছিল সব জানতে বাড়ি যাব। দেশ স্বাধীন হয়েছে তিন বছর হতে চলল। কিন্তু আমি বাড়ি যেতে পারছি না। এ সময় আবার সংকট দেখা দিল সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের নিয়ে। সরকার নিউজ প্রিন্ট নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করেছে। সংসদের লবণ সংক্রান্ত একটি খবর রিপোর্ট করতে গিয়ে দু’জন পূর্ববঙ্গের রিপোর্টার চাকরি হারিয়েছে। আমার আর বাড়ি যাওয়া হলো না।
এসময় মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত। নিজেকে মনে হতো লেখাপড়া না করলে ভালো হতো। আমার পড়া কিতাবের কোনো কিছুই কাজে লাগছে না। দেশে মুখ্যত তখন তিন দলের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক জোট ‘গজ’ গঠন করেছে। মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা তাদের। অন্য কারো কিছু বলার নেই। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা ভিয়েতনামে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে গুলি খেয়েছিল। প্রায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। এবার ভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছে। শ্লোগান হচ্ছে-দেশ স্বাধীন করেছি, এবার দেশ গড়ার পালা। সত্যি সত্যি ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা অধিক খাদ্য ফলাও অভিযানের অঙ্গ হিসেবে বীজতলা গড়ে তুলল। জিজ্ঞাসা করলে বলত ওটা আপনারা বুঝবেন না। আপনারা হটকারী। প্রকৃতপক্ষে সেকালে কমিউনিস্ট পার্টি চলত মস্কোর নির্দেশে। তাদের তত্ত্ব হচ্ছে, মস্কোর সাথে যে দেশের সম্পর্ক ভালো সে দেশের সরকারও ভালো। সেই অনুসারে বাংলাদেশ সরকারও ভালো। বাংলাদেশের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সুসম্পর্ক। তাই বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন করতে হবে। ন্যাপের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকলেও রাজনীতি একই।
অপরদিকে সক্রিয় জাসদের গণবাহিনী আর সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি। এদের কাজ থানা লুট, ফাঁড়ি লুট এবং নির্বাচিত হওয়া। এছাড়াও কোনো কোনো এলাকায় সক্রিয় ছিল পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি। এদের রাজনীতি ছিল আমার কাছে দুর্বোধ্য। ১৯৭৪ সালের ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় শ্লোগান শুনেছি। তাদের সাথে জেল খেটেছি। দিনের পর দিন অনশন করেছি। তাদের রাজনীতি আমি বুঝতাম। ১৯৪৭ সালের আজাদী গরিব মানুষের জন্যে ঝুটা ছিল তাতে সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন ছিল ওই সময় ওই শ্লোগানের ভিত্তিতে ওই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব ছিল কিনা। আমার ধারণা সে সময়ে শ্লোগান দিয়ে অসহ্য নির্যাতন সহ্য করেছে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা। তবে সংগঠন মজবুত থাকায় এত নির্যাতনের পরেও টিকে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে কেন যে আমাদের বন্ধুরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াকে একেবারে তোয়াক্কা না করে পূর্ব বাংলা আবার কেউ পূর্ব পাকিস্তান নাম বহাল রেখেই বিপ্লব করতে চাইল তা আজো আমার বোধগম্য নয়। এ ভুল কৌশলের ফলে প্রথমেই ডেকে আনা হলো সরকারি হামলা। কেউ বুঝতে চাইলেন না, অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করার পর ওই নাম দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে এবং এ কৌশল গ্রহণযোগ্য হবে না ইতিহাসের বিচারে। এই দু’রাজনীতির যাঁতাকলে আমি বিপর্যস্ত। আমি সর্বত্র আসামির কাঠগড়ায়। কখনো সংবাদপত্রে লিখি, রাজনীতি করি। সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। সকলের সকল অধিকার রক্ষার একটি দায়িত্ব এই সাংবাদিকদের।
