কিন্তু এখনো আমি বিশ্বাস করি সেদিন আমি সঠিক কথা বলেছিলাম। ১৯৭৪ সালের পরিবর্তে ১৯৭২ সালে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলে দেশ ও জাতি অনেক লাভবান হতো। আরো দুঃখের হচ্ছে এ কাজটি আমাদের করতে হলো সিমলাচুক্তি অনুযায়ী। অথচ এ চুক্তির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারতে আটক ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ চুক্তি কেন আমাদের মানতে হলো সে প্রশ্নের ব্যাখ্যা কেউ কোনোদিনই দেননি।
এই সাধারণ ক্ষমার পর আমাকেই আবার নতুন ঝামেলায় পড়তে হলো। সিলেটের কুলাউড়া থেকে এক ভদ্রমহিলা আমার নামে দৈনিক বাংলায় একটি চিঠি লিখলেন। তিনি লিখেছিলেন–সাহস থাকলে এ চিঠি কাগজে ছাপাবেন। চিঠিতে সাধারণ ক্ষমা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, ৭১-এর যুদ্ধে তিনি ইজ্জত হারিয়েছেন। তাঁর স্বামী হারিয়েছেন। আগরতলা ত্রাণ শিবিরে তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর শিশু পুত্রকে। লাখ লাখ মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছে। প্রাণ দিয়েছে। এদের শবের ওপর দাঁড়িয়ে রাজাকারদের ক্ষমা করার অধিকার প্রধানমন্ত্রীকে কে দিয়েছে? তিনি প্রশ্ন করেছিলেন এভাবে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ঘনিষ্ঠজন কি আদৌ প্রাণ দিয়েছে? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে–অন্যের শবের উপর দাঁড়িয়ে কাউকে ক্ষমা করার অধিকার প্রধানমন্ত্রীর নেই।
এ চিঠি আমি ছেপে দিলাম দৈনিক বাংলায়। তবে তার সাথে আমার কিছু মন্তব্য ছিল। আমি বলতে চেষ্টা করেছিলাম, শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে কোনোদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। আজ হোক কাল হোক আবেগকে যুক্তিগ্রাহ্য করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এ সফর নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল। ভুট্টো আসার আগে প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ আমাকে ফোন করেন। কিছু একটা লিখুন। ভুট্টো আসছে অথচ আপনারা কেউ কিছু লিখছেন না। এ কেমন কথা। একজনকে কিছু লিখতে হবে।
সেদিন আমার পক্ষে লেখা ছিল খুবই কষ্টকর। তবুও লিখেছিলাম। সে লেখার কিছু কিছু কথা এখনো আমার মনে আছে। আমি লিখেছিলাম ভুট্টো আসবে। আর সেদিন হয়তো সংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন ও শহিদুল্লাহ কায়সারকে আমার মনে পড়বে। আমার চোখে জল নামবে। তবুও ভুট্টো আসবে। এটাই বাস্তব। কিছুদিন পর গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা। তিনি বললেন, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। ভুট্টো আসবে, এ বাস্তবতা অস্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব কি!
১৯৭৪ সালে আর এক ঘটনা হচ্ছে দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ নাকি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে তাঁর তত্ত্ব লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অমর্ত্য সেন তার জীবনে দুটি দুর্ভিক্ষ দেখেছেন। একটি ১৯৪৩ সালে। অপরটি ১৯৭৪ সালে। এই দুই দুর্ভিক্ষ থেকে তার অভিজ্ঞতা হচ্ছে-খাদ্যের অভাবই দুর্ভিক্ষের কারণ নয়। প্রচুর পরিমাণ খাদ্য জমা থাকলেও দুর্ভিক্ষ হয়। সেই খাদ্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা সেটাই বড় কথা। এই পৌঁছানোর সাথে জড়িত সরকারি নীতি এবং জনসাধারণের ক্রয় ক্ষমতা। তাঁর মতে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্যে খাদ্য অভাব দায়ী ছিল না। আর আমার মতে, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে একটি ভিন্ন সমস্যাও ছিল। সমস্যাটি হচ্ছে যোগাযোগের অভাব। আমি যতদূর জানি তখন রাজনৈতিক কারণে খাদ্যের অভাব ছিল। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে দুটি অপরাধ করেছিল। একটি অপরাধ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরম শত্রু কিউবার সাথে সম্পর্ক স্থাপন। দ্বিতীয় অপরাধ হচ্ছে ঢাকায় বিশ্ব শান্তি পরিষদের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়া শান্তি সম্মেলন। এই দুই অপরাধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশগামী খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশে খাদ্যের অভাব সৃষ্টি করে। দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে অমর্ত্য সেনের তত্ত্ব বোঝাও আমাদের মতো দরিদ্র দেশের জন্য কঠিন নয়। কিন্তু ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের যে এমন একটি রাজনৈতিক কারণ ছিল এবং সত্যি সত্যি যে খাদ্যশস্যের অভাব ছিল একথা ভুললে চলবে না।
তবে দুর্ভিক্ষের ভিন্ন কারণও ছিল। সে কারণটি হচ্ছে সরকারি দলের দুর্নীতি, দূরদৃষ্টির অভাব এবং সমস্যা মোকাবেলায় নিদারুণ ব্যর্থতা।
এই দুর্ভিক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশে এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সকলের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়–এই জন্যই কি আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম? এর চেয়ে তো পাকিস্তান ভালোই ছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চিৎকার করা যেত। কিন্তু এখন তো কিছু বলা বা করা যাচ্ছে না। সভা-সমাবেশ মিছিলে সরকারি দল হামলা করে। ট্রেড ইউনিয়ন হাইজ্যাক করে। কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই। রক্ষী বাহিনীর হাতে কবে কতজন নিহত হচ্ছে সে খবর কেউ দিতে পারে না। অসংখ্য তরুণ গ্রেফতার হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তাদের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে আছে সংশয় ও বিভ্রান্তি। কেউ জানে না দুর্ভিক্ষে কত লোক মারা গেছে। এ নিয়ে জনমনে প্রচণ্ড অসন্তোষ। এ সময় সংসদে জানানো হয় দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ২৭ হাজারের কিছু বেশি। এ তথ্য সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করল না।
