পরিস্থিতি এমন হলে একাত্তরের পরে টগবগে অশান্ত তরুণদের দলে টানা যেত। তাদের আকৃষ্ট করা যেত। আমি মনে করি বামপন্থীদের ভূমিকার জন্যেই আওয়ামী লীগের সেই অশান্ত তরুণরা ভিন্ন দল করেছে। প্রতিষ্ঠিত কোনো বাম দল তাদের টেনে নিতে পারেনি।
তবে ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব বাংলা স্বাধীনতার ডাক দিয়ে একটি নতুন দল আত্মপ্রকাশ করেছিল। দলটির নাম সর্বহারা পার্টি। নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সিরাজ সিকদার। দলটি কখনো ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে আসেনি। এ দলের অনেক সদস্যই অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু এক সময় কোনো অর্জন ছাড়া এ দলের জীবন দেয়াটাই বড় হয়ে উঠেছিল। ফলে দেখা দেয় অভ্যন্তরীণ সঙ্কট এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। এ দলটি চমক সৃষ্টি করলেও কোনো বিকল্প রাজনীতির ছবি তরুণদের চোখের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।
এই প্রেক্ষাপটেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একটি নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। একটি রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। জন্ম নিয়েছিল একটি সংগ্রামী তরুণ গোষ্ঠী। সেকালের বামপন্থীরা তাদের ধারণ করতে পারেনি। ধারণ করতে পারলে এদেশের ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হতো।
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন বিপর্যস্ত। আমরা মাত্র কয়েকটি দল। অলি আহাদ সাহেবের জাতীয় লীগ, লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, ভাসানীপন্থী ন্যাপ ও আমাদের দল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। আন্দোলনে জাসদের ভূমিকা নড়বড়ে। মলানা ভাসানীর ভূমিকাও স্পষ্ট নয়। তিনি কোনো যৌশ সিদ্ধান্ত মানেন না। আমরা এক সময় আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছিলাম। তিনি নির্দিষ্ট দিনের আগেই এসে নিজে নিজেই আইন অমান্য করলেন। কাগমারি চলে গেলেন। শুনলাম তিনি অন্তরীণ হয়েছেন। এ ব্যাপারে আমার বরাবরই সংশয় ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে মওলানা সাহেব গ্রেফতার হতে পারেন বা তাকে অন্তরীণ করা হতে পারে এ কথা আমি আজো বিশ্বাস করি না। এ সময় কখনো কখনো গ্রেফতার হতেন মশিউর রহমান এবং অলি আহাদ। এর মধ্যে মশিউর রহমান সম্পর্কে নানারকম কথা ছিল। সবচে’ বেশি বিভ্রান্তি ছিল এককালের পিকিংপন্থীদের নিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা যে কত ভাগে বিভক্ত হয়েছিল সে হিসাব করা আজো কঠিন। মতিন, আলাউদ্দিন, হক, তোয়াহা, জাফর-মেনন, এর পরে সর্বহারা পার্টি। এ নামগুলো তখন পিকিংপন্থী বলে বলা হতো। আবার এদের মধ্যেও দল-উপদল ছিল। কারো সাথে কারো সদ্ভাব ছিল না। অপরদিকে মস্কোপন্থী বলে কথিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, দুই ন্যাপ এবং একতা পার্টি তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে। ফলে আন্দোলন গড়ে তোলাই ছিল কষ্টকর। আত্মগোপন করা সর্বহারা পার্টি কখনো কখনো হরতাল ডেকে বা থানা লুট করে চমক সৃষ্টি করত। আন্দোলনের পরিবর্তে সৃষ্টি হতো ভয় এবং শঙ্কা।
তখন আমার নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হতো। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান আমলের কাঠামো নেই। আমাদের দল সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। দু’বছর না কাটতেই স্বাধীনতা সংগ্রাম। দল দাঁড়াতেই পারছে না। এককালে শিল্প এলাকায় শক্তিশালী ছিলাম। তাই সকলের লক্ষ্যবস্তু আমরা। আমাদের দলছুটরাই জাতীয় শ্রমিক লীগ গঠন করে এবং সরকারের ছায়ায় একের পর এক আমাদের ইউনিয়ন হাইজ্যাক করতে শুরু করে। ঢাকায় প্রতিবাদ সভা করা যায় না। সরকারি দল হামলা করে। থানায় এজাহার করা যায় না। আমি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বলে কিছু কিছু সামাল দিতে পারি। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়নের অবস্থাও ভালো নয়।
আমি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হয়েছি। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়নে আমার দলের একজন সদস্য নেই। ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ, মোজাফফর ন্যাপ, ভাসানী এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যাই বেশি। এদের মধ্যে অনেককেই অন্ধ সরকার বিরোধী। আবার অনেকে সরকারের অন্ধ সমর্থক। যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি ইউনিয়নের তাদের সংখ্যাও কম নয়। অপরদিকে ইউনিয়নের প্রবীণ নেতারা অধিকাংশ পেশা ছেড়ে চলে গেছেন। অনেকে খুন হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বিধান করা আদৌ সহজ ছিল না। এরপরে ছিল স্বাধীনতা উত্তর অস্থিরতা। হুমকি এবং সন্ত্রাস। আমি নিতান্তই বিব্রত। দেশ স্বাধীন হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকা ফিরতে ফিরতে ডিসেম্বর শেষ। তারপর ৭২-৭৩ চলে গেছে। বাড়ি ফিরতে পারিনি। ঢাকায়ই থাকতে হয়েছে। আমার ভাবনার মধ্যে হয়তো একটা বাড়াবাড়ি ছিল। ভাবতাম ঢাকা ছেড়ে গেলে কী অবস্থা হবে। দলের প্রতিদিনের সমস্যা, ইউনিয়নের প্রতিদিনের সঙ্কট। এ সঙ্কটকে মোকাবেলা করবে কে?
এর মধ্যে গ্রাম থেকে একটি খবর এল। খবর হচ্ছে কোটালীপাড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নাম হয়েছে শেখ লুত্যর রহমান আদর্শ মহাবিদ্যালয়। নাম পরিবর্তন করেছে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা, যারা কোনোদিন এই কলেজ প্রতিষ্ঠার ধারে কাছেও ছিল না। দেশ স্বাধীন হবার পর তারা সব ব্যাপারেই কর্তা সেজে বসেছিল। এরপর একদিন কলেজের অধ্যক্ষ প্রেসক্লাবে এসে আমার সাথে দেখা করলেন। তিনি বললেন, তিনি কলেজে একটি নতুন বিভাগ খুলেছেন। এই বিভাগে মুজিববাদ পড়ানো হবে। আমি অবাক বিস্ময়ে অধ্যক্ষের দিকে তাকালাম। মনে পড়ল ৭১ সালে তার ভূমিকা এবং মনে হলো সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্যে তিনি এ কাজটি করেছেন। তিনি আমাকে জোর করেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি বললাম, আপনি মুজিববাদের অর্থ জানেন? কলেজে এই বিভাগ খোলবার আগে আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে এই বাদের ব্যাখ্যা কী। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সাম্যবাদের সংজ্ঞা বই পুস্তকে আছে। মুজিববাদের এমন একটা সংজ্ঞা আপনি দিতে পারবেন? তিনি চুপ করে গেলেন।
