এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে কেন্দ্র করে বিভক্তি দেখা দেয়। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টি একান্তভাবেই বিদেশ নির্ভর বলে একেবারে যান্ত্রিকভাবে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতেও মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী হিসেবে বিভক্তি দেখা দেয়। ১৯৫৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ গঠন করে। কমিউনিস্ট পার্টির কথায় এ দলটি ছিল প্রগতিশীল জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিষ্ঠান। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় এ দলের মাধ্যমে তারা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতিপূর্বে কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কিছুটা কাজ করতো। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসার পর বামপন্থীদের পক্ষে আওয়ামী লীগে কাজ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক। আর সেটা ছিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তখন তীব্র সংঘর্ষ ছিল। এই সবকিছু মিলেই এদেশের কমিউনিস্টদের আওয়ামী লীগ করা সম্ভব ছিল না এবং তাদের উদ্যোগেই গঠিত হয় ন্যাপ। আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষণীয় যে পিকিং মস্কো দ্বন্দ্ব ন্যাপেও প্রভাব ফেলে। ন্যাপ বিভক্ত হয়ে যায়। ন্যাপের প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। আর মস্কোপন্থী অংশের প্রেসিডেন্ট হলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের এ বিভক্তি বামপন্থী আন্দোলনে বিপর্যয় ডেকে আনে। পরবর্তীকালে দুই ন্যাপেই ভাঙন সৃষ্টি হয়। মস্কোপন্থী নামের ভাঙন সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে হলেও পিকিংপন্থী ন্যাপের ভাঙনের কোনো শেষ ছিল না। এদের কোনো কোনো অংশ ৭১-এর যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। আর মস্কোপন্থী ন্যাপের বন্ধুরা মস্কোর নির্দেশ ব্যতীত কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে গোপনে। তারা যতই দলিল লিখুক না কেন প্রকাশ্যে তাদের ভূমিকা ছিল বিভ্রান্তিমূলক। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পূর্বে তাদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করেনি। এ হলো কমিউনিস্ট বামপন্থীদের কথা। আর আমরা যারা আরএসপি করতাম তাদের বিপদ ছিল নানা দিক থেকে। শুধুমাত্র সরকার বা বুর্জোয়া দলগুলোর পক্ষ থেকে নয়, মস্কো এবং পিকিংপন্থী দুই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আমাদের ঘোর বিরোধী। আমাদের সম্পর্কে কোনো তাত্ত্বিক লেখাপড়া না করেই আমাদের ট্রটস্কিবাদী বলে অভিহিত করত। আমার ছাত্রজীবন থেকে আমি নিশ্চিত যে আমাদের ওই বন্ধুদের অধিকাংশ ট্রটস্কির কোনো বইয়ের একটি পাতাও উল্টিয়ে দেখেনি। অনেককে আমি হেসে ইংরেজিতে ট্রটস্কি নামের বানান জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পাইনি। তাদের এই অন্ধতা ও অন্ধ বিরোধিতা আমাদের পদে পদে বিব্রত করত। মস্কো পিকিং বিভক্তির আগে ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা বলতেন তাঁরাই একমাত্র কমিউনিস্ট। অন্য সবাই আমেরিকার এজেন্ট। এই মনোভাব থেকেই তারা ৬০-এর দশকে আমাদের নেতৃত্বে আইয়ুব আমলে ঐতিহাসিক চটকল শ্রমিক ধর্মঘটের সময় তারা মালিকের সাথে সহযোগিতা করেছে। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে ধর্মঘট ভেঙেছে। আর এই চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের সাফল্যের মধ্য দিয়েই ষাটের দশকে আমরা রাজনীতিতে পথে উঠেছিলাম। ১৯৬৯ সালে এককালের আরএসপির নেতা ও কর্মীদের উদ্যোগে আমরা গঠন করেছিলাম শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। এ দল গঠনের এক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আসন্ন হয়ে উঠল। এ কথা সত্য, চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট শিল্প এলাকায় এক নতুন সংগ্রামের পরিবেশ সৃষ্টি করে। খুলনা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সকল শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। তখন শ্রমিক এলাকায় আমরা ছাড়া কাজী জাফরদের সংগঠন ছিল টঙ্গী এলাকায়। আমরা আন্দোলন করেছিলাম কঠোর সামরিক সরকারের আমলে। আইয়ুব খান তখন প্রেসিডেন্ট। মোনায়েম খান গভর্নর। এই আন্দোলনে আমাদের সাফল্যে শ্রমিকরা সাহসী হয়ে উঠল। ষাটের দশকের শেষ দিকে ঘেরাও আন্দোলনের শরিক হয় এবং সেই জোয়ারেই তারা ১৯৭১ সালের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আমাদের বাম প্রগতিশীল কোনো লেখকের লেখায় এই ইতিহাস পাওয়া যাবে না। তাঁরা লিখবেন না যে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল। এককভাবে সবকিছু যেন তারা করেছেন। অথচ একাত্তরের পূর্বেও সে আন্দোলনে তাঁদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না।
কিন্তু ৭১-এর সংগ্রামে আমাদের তেমন ইতিবাচক ভূমিকা ছিল না। আমরা আমাদের শ্রমিকদের ৭১-এর সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম কি? আদৌ নয়। আমি ইতোপূর্বে বারবার উল্লেখ করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। এ ব্যাপারে সেকালের বিভিন্ন আত্মগোপনকারী বামপন্থী দলসহ ছাত্রলীগের নেতারাও আমাদের সাথে কথা বলেছেন। আমরা বারবারই বলেছি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা আমরা জানতে চাই। আমরা আর একটা পাকিস্তান গড়তে চাই না। আমরা শোষণমুক্ত বাংলাদেশ চাই। এ কথায় আমাদের সাথে আলোচনা ভেঙে গেছে।
আমাদের ভূমিকা ওই পর্যন্তই। এর পরে আমরা দেশ স্বাধীন কর নিজস্ব লেনো উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকেছি। ১৯৭১ সালে সশ্রাম শুরু হওয়ার পর আমরা গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছি। আমার জানা মতে এটাই ছিল মোটামুটিভাবে বামপন্থীদের ভূমিকা।
