জাসদ ছিল মূখ্যত একটি দুঃসাহসী টগবগে তরুণের দল। এরা অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। তাদের চোখে অনেক স্বপ্ন। তাদের জীবন দেবার নেশা অফুরন্ত। তাদের চোখে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন রূপায়নের কোনো পরিকল্পনা তাদের চোখের সামনে নেই। অভিজ্ঞতা নেই নেতৃত্ব নেই। আছে অশান্ত তারুণ্য। এই তরুণদের স্বপ্ন ধারণ করা আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ কোনো সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে বিশ্বাসী দল নয়। আওয়ামী লীগ উঠতি বাঙালি ধনীদের একটি নড়বড়ে প্রতিষ্ঠান। এই আওয়ামী লীগ থেকে বিপ্লবের চিন্তা করা বাতুলতা মাত্র। এই অশান্ত তরুণদের বাঁচাতে হলে আওয়ামী লীগ ছাড়তেই হবে।
কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে? এই তরুণেরা কেন সংগঠন গড়ে তুলবে। এই তরুণরা সবাই কি একই মত-পথে বিশ্বাসী? শুধুমাত্র তারুণ্যের উসই কাউকে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী করে তোলে না। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে ত্যাগ, তিতীক্ষা ও অনিশ্চিত সংগ্রামী জীবনকে গ্রহণ করে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামের পথে এগুতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয় দলীয় কাঠামো। সব প্রশ্নের সিদ্ধান্ত নিতে হয় শ্রেণির ভিত্তিতে। জাসদের ক্ষেত্রে তার কোনোটাই ঘটেনি। আওয়ামী লীগ ছেড়ে আওয়ামী লীগের মতো একটি সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে জাসদ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবস্থা এমন না হলে মেজর জলিলের মতো রাজনীতিতে একান্ত অপরিচিত ব্যক্তি হুট করে জাসদের সভাপতি হতে পারতেন না। অর্থাৎ প্রথম থেকেই একটি গোজামিলের ভিত্তিতে জাসদের সৃষ্টি হলো। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের মতোই একটি রাজনৈতিক দল দাঁড় করাবার চেষ্টা হলো। আর প্রশ্ন দেখা দিল ভিন্ন ক্ষেত্রে।
লক্ষ্য সমাজতন্ত্র অথচ সাংগঠনিক কাঠামো আওয়ামী লীগের। এই কাঠামো নিয়েই সংগ্রাম করতে হবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। তাহলে সরকারি দলের সাথে তফাৎ কোথায়? এ তফাৎ দেখাতে গিয়ে বিপত্তি ঘটল। একমাত্র কড়া কড়া কথা, প্রতিদিন হুমকি এবং যখন তখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি জাসদের নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়াল। কারণ এই অশান্ত তরুণদের হাতে রাখতে হলে তাদের কাজ দিতে হয়। একটি সমাজতন্ত্রী দল সে কাজ খুঁজে নেয় শ্রমিক কৃষক এবং মেহনতি মানুষের এলাকায়। খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে শক্তিশালী সংগঠন থাকলেই রাজপথের আন্দোলন শক্তিশালী হয়। একটি শ্রেণি ভিত্তি পায়। জাসদ তার জন্মলগ্নে এভাবে শ্রেণিভিত্তি ও শক্তি অর্জনের পূর্বেই প্রকাশ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এটা ছিল নেতৃত্বের এক ধরনের চমক। নিজেদের ভেজাল রাজনীতি গ্রহণযোগ্য করার জন্যে কথায় কথায় তরুণদের ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামে। এ ধরনের একটি কাজই ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদ করেছিল। আমি যতদূর জানি কোনো পূর্ব সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিন পল্টন ময়দান থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার জন্যে জাসদের মিছিল গিয়েছিল। সেদিন কেন মিছিল গিয়েছিল তার প্রকৃত ব্যাখ্যা কোনোদিন পাওয়া যায়নি। আর আমার মনে হয়েছিল এটাও ছিল জাসদের লক্ষ্যহীন রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি।
তবে এর একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের মতে জাসদ ছিল একটি তরুণের দল। এরাই ছিল ১৯৭১ সালের সংগ্রামের স্থপতি। এরা ছয়কে নয় করতে পারে। ১৯৭১ সালের সংগ্রামের পর তাদের নিয়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরের একটি ভয় ও শঙ্কা ছিল। ভয় ছিল এরা হয়তো বাম রাজনীতিতে ঝুকবে। সমাজতন্ত্রের পথ ধরবে। এরা এখন স্বপ্নীল। এরা ঐক্যবদ্ধ হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন অনিবার্য। তাই এদের ঠেকাতে হবে। লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঠেকাতে হবে। লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঠেকাবার মতোই সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে হবে। এই হঠকারী শ্লোগানের ভিত্তিতে প্রতিদিন আন্দোলন করতে গিয়ে ওই টগবগে তরুণগুলো নিঃশেষিত হবে। আর সাধারণ মানুষের কাছে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটাই হবে ভয় এবং শঙ্কার। প্রশ্ন উঠতে পারে সমাজতন্ত্র বিরোধীরা যদি সবকিছু বুঝেশুনে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে তবে বামপন্থীরা কিছু করল না কেন? আজকে আমার কথায় নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়, আমার মতো বামপন্থী সবকিছুই বুঝতে পেরেছিলাম। আবার একথাও প্রমাণিত হয় যে, আমাদের ব্যর্থতা পর্বতপ্রমাণ। এরও একটি পটভূমি আছে।
প্রশ্ন উঠেছিল সেকালের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিয়ে এমন ষড়যন্ত্র করতে পারলে তৎকালীন। বামপন্থীরা কী করেছিল। একদল অশান্ত মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণ দেশের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোতে যোগ না দিয়ে নতুন দল গড়তে গেল কেন? বিদেশিরা ষড়যন্ত্র করল একথা বললেই কি এ প্রশ্নের জবাব হয়ে যায়?
আমার জবানবন্দিতে এ প্রশ্নের জবাব আমি বারবার দিতে চেষ্টা করেছি। আজকেও আমার জবাব হচ্ছে সেকালে বাংলাদেশে বামপন্থীদের জীর্ণ দশা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নতুন করে কোনো বামপন্থী দল জন্মগ্রহণ করেনি। সর্ব ভারতীয় সূত্রে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আরএসপি)-এর অস্তিত্ব ছিল। দু’টি দলের নেতৃত্বে ছিল মধ্যবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায়। দেশ বিভাগের ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয়। অপরদিকে নেমে আসে পাকিস্তান সরকারের চরম নির্যাতন। কমিউনিস্ট পার্টি তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ফলে কোনোরকম টিকে থাকলেও আরএসপির অস্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে যায়। আত্মগোপন করে কমিউনিস্ট পার্টি অস্তিত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করে। অপরদিকে আরএসপি শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।
