১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সে ঐতিহ্য অব্যাহত ছিল। গণতন্ত্রের সংগ্রামে সাংবাদিকদের বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। মানুষ মনে করতো সাংবাদিকরা সব সমস্যার সমাধান দেবে। তারাই গণতন্ত্রের লড়াই করবে।
কিন্তু কেউ লক্ষ করলো না যে, ১৯৭১ সালের পর জাতীয় জীবনে একটি মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে একটি ঐক্য ছিল। সেই ঐক্য থাকার জন্যে সাংবাদিকদের মধ্যেও ঐক্য ছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এককালের সংগ্রামের শরিক আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। বাকি সব বিরোধী দলে। তাই সাংবাদিকদের সমস্যাও এখন অভিন্ন নয়। এ পরিস্থিতি কেউ অনুধাবন করল না। সংবাদপত্র শিল্পে একের পর এক সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকল। ওই সমস্যা জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও সকলে আগের মতো পাশ কাটিয়ে থাকল যে সাংবাদিকরাই সকল সমস্যার সমাধান করবে।
এ সময় সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলাম আমি। তাই ঢাকা বিমানবন্দরের পৌঁছে গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদের গ্রেফতারের খবর শুনে মনটা খিঁচিয়ে গেল।
বুঝলাম ঘটনাটি জাসদ ও আওয়ামী লীগ সরকার ঘটালেও এর দায় বহন করতে হবে আমাদের অর্থাৎ সাংবাদিকদের।
জাসদ ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও করেছিল। সেই ঘেরাওকে কেন্দ্র করে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য আছে। বলা হয় জাসদের মিছিল থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভবন লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। অপর পক্ষে বলা হয় রক্ষীবাহিনী জাসদের মিছিলে বেধড়ক গুলিবর্ষণ ও লাঠিপেটা করেছিল। কোন পক্ষের বক্তব্য সত্য সে নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ওই দিন যে অসংখ্য জাসদ কর্মী ও নেতা আহত ও নিহত হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি তখন পূর্ব ইউরোপে ছিলাম। কোনো খবরই পাইনি। ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছাতেই বিমান কর্মীরা বলল, আবার গণকণ্ঠ বন্ধ হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন গণকণ্ঠের সম্পাদক।
আমি খানিকটা অবাক হলাম। বুঝতে পারলাম যে জাসদ এ ধরনের একটি ঘেরাও কেন করল। ঘেরাও করতে হলে প্রধানমন্ত্রী ভবন ঘেরাও করাই স্বাভাবিক ছিল। তারা সে কাজটি করল না। সকলেরই জানা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বাসায় ছিলেন না। এরপরও কেন যে জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসা ঘেরাও করেছিল সে ব্যাখ্যা আজো আমি পাইনি। তবে বেশ কিছুদিন যাবত জাসদের মধ্যে একটি অস্থিরতা লক্ষ্য করেছিলাম। আমার ধারণা জাসদের এ অস্থিরতা ছিল জন্মলগ্ন থেকেই।
জাসদের জন্য আমার কাছে অনেকটা রহস্যময় ছিল। আমার রাজনীতির প্রথম দিন থেকেই আমি সমাজতন্ত্রের একটি দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। দীর্ঘদিন তাদের ছাত্রফ্রন্টের কাজ করেছি। কিন্তু দলের সদস্যপদ পাইনি। এমনকি সদস্য পদের জন্যে আবেদনের অনুমতিও দেয়া হয়নি। ছাত্রফ্রন্টের সেল-এর সদস্যপদও পাইনি। এ ধরনের দলের সদস্যপদ পাওয়া খুবই কঠিন। দীর্ঘ দিনের পরীক্ষা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এসকল দলের সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। অথচ একদিন সুপ্রভাতে ঘোষণা হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ নামে একটি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলের জন্ম। এ দলের লক্ষ্য হচ্ছে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এবং লক্ষ করলাম রাতারাতি এ দলের সদস্যসংখ্যা হাজার থেকে লক্ষের কোঠায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। এ দলের লক্ষ্য সম্পর্কে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল দলটি যদি সমাজতন্ত্র চায় তাহলে ঘটা করে বৈজ্ঞানিক কথাটি লেখার দরকার কী। তাতে কী বাড়াবাড়ি হয়ে যায় না কি।
কেউ নিশ্চয়ই প্রশ্ন করতে পারেন এই উপমহাদেশে অনেক আগে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম নিয়েছে। কমিউনিস্ট শব্দের আগে বিপ্লবী শব্দটি বসানো গেলে সমাজতন্ত্রের আগে বৈজ্ঞানিক শব্দটি বসাতে আপত্তি কোথায়? আমার জবাব হচ্ছে, ভারতে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠনেরও একটি ইতিহাস ও তাৎপর্য আছে। বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (Revolutionary Communist Party of India–RCI) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সৌমেন্দ্র ঠাকুর লেনিনের সমসাময়িক ছিলেন। এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের সাথে তাঁর মতানৈক্য হয়। ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। সেই পটভূমিতে সৌমেন ঠাকুর বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। বাংলাদেশের জাসদের কাছে এ সমস্যা ছিল না। জাসদ-জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ইংরেজিতে National Socialist Party। জার্মানির হিটলারের দলেরও একই নাম ছিল। সেই নাম গ্রহণ করে ললাটে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র লিখে দিলে যে সংশয় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয় এ ধরনের দল গঠনের কারণ কী। আওয়ামী লীগ থেকে ভেসে এসে এ ধরনের একটি সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের তখন কোনো কার্যকারিতা ছিল কি এবং তখন থেকেই আমার ধারণা ছিল রাজনীতিতে একটি গোজামিল দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। একথা আমি পূর্বেও লিখেছি এবং লক্ষ করা গেছে, এ ধরনের গোজামিলের ফলে জাসদ প্রথম থেকেই অস্থিরতায় ভুগছে। তাদের পক্ষে কখনো সম্ভব ছিল তাদের আশু এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণের।
