প্রায় মাস খানেক পর ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরেই খবর পেলাম ভিন্ন। ধরনের। ১৭ মার্চ জাসদের মিছিলে গুলি হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদ।
মনটা খিঁচিয়ে গেল। ভাবলাম দেশে ফিরে আরেক গোলমালে পড়তে হবে। আবার সরকারের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় যেতে হবে। এক অপূর্ব দেশে জন্মগ্রহণ করেছি আমরা। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তার যেনো তুলনা নেই।
পৃথিবীর যে কোনো দেশে পত্রিকা বন্ধ হলে বা সম্পাদক গ্রেফতার হলে প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ করে রাজনৈতিক দল। তারা মিছিল করে। সমাবেশ করে। প্রতিবাদ করে। তাদের কাছে পত্রিকা বন্ধ হওয়া বা সম্পাদক গ্রেফতার হওয়া গণতন্ত্রের ওপর হস্তক্ষেপ। তাই গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং শ্রমিক সংগঠন সামনে এগিয়ে আসে।
কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকে আমাদের দেশে তেমনটি ঘটেনি। সব দায়িত্ব নিতে হয়েছে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র কর্মচারীদের। কাউকে বোঝানো যায়নি, পত্রিকা বন্ধ হলে সকলের বাকরুদ্ধ হবে। এখানে মুখ্য প্রশ্ন সাংবাদিক ও সংবাদপত্র কর্মচারীদের রুটি-রুজির নয়। এ ক্ষেত্রে মুখ্য প্রশ্ন গণতন্ত্র। কিন্তু তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর টনক নড়েনি। দু’একটি বিবৃতি দিয়ে তারা দায়িত্ব শেষ করেছে। পাকিস্তান আমলে বারবার সংবাদপত্র বন্ধ হয়েছে। আইয়ুব আমলে ইত্তেফাক বন্ধ হয়েছে। সেকালে ইত্তেফাক ছিল তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও দাবি আদায়ের মুখপত্র। সেই ইত্তেফাক বন্ধ করা হলে কেউ হরতাল বা ধর্মঘট ডাকেনি। ধর্মঘট ডেকেছে সংবাদপত্র শিল্পের কর্মচারীরা।
এ ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের এবং এ ঐতিহ্যের একটি ভিন্ন কারণও আছে। এই ঐতিহ্যের জন্যে লক্ষ করা গেছে সেকালের পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলো কখনো কখনো রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করেছে।
তাই লক্ষ করেছি এদেশের মানুষ কোনো অঘটন ঘটলে প্রেস ক্লাবের দিকে তাকিয়েছে। দেখার চেষ্টা করেছে সাংবাদিকরা কিছু করছে কিনা। তারা তাকিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সকলের প্রত্যাশা কেউ প্রতিবাদ না করলেও এদেশের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ করবেই। তাই লক্ষ করা গেছে পাকিস্তান আমলে রাজনীতির দুই প্রধান কেন্দ্র ছিল প্রেসক্লাব ও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন।
এ প্রেক্ষিতেই ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় রাজনৈতিক নেতারা প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলেন। সাংবাদিকরাই সেকালের ঐতিহাসিক ঘোষণা ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ প্রণয়ন করেছিলেন। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের সব ক’টি প্রধান দৈনিকের এ ঘোষণা প্রথম সংবাদ হিসেবে ছাপা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রেস ক্লাব এবং সাংবাদিকরা ছিল প্রথম সারিতে।
ঠিক একইভাবে আর একটি ঘটনা ঘটেছিল আইয়ুব আমলে। খাজা সাহাবুদ্দিন তখন পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী। তিনি ঢাকার প্রেস ক্লাবে এসে ঘোষণা দিলেন, বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলো।
সে সময় কৌতুক করে বলা হতো, গভর্নর মোনায়েম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান আবদুল হাইকে নাকি প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না কেন?
খাজা সাহাবুদ্দিনের এ ঘোষণার পর সারাদেশে বুদ্ধিজীবীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। তার নেতৃত্বেও ছিল ছাত্র সমাজ ও প্রেস ক্লাব। এর পেছনে ছিল আর একটি ইতিহাস।
সে ইতিহাসের জন্য পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই। সেকালে যারা সংবাদপত্রে কাজ করত তাদের অধিকাংশই ছিল বাম দলের সদস্য। পরবর্তীকালে সংবাদপত্রই বামপন্থীদের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়াল। বামপন্থীরা গ্রেফতার হতো রাজনৈতিক কারণে। তারা কোথাও চাকরি পেত না। চাকরি পেতে হলে পুলিশের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হতো। সংবাদপত্রে চাকরিতে পুলিশের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হতো না এবং বাঁচার স্বার্থে যে কোনো মাইনেতে বামপন্থীরা সংবাদপত্রে চাকরি নিত। চাকরিতে তারা ছিল একনিষ্ঠ। রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, কে জি মুস্তফা, হাসানুজ্জামান খান, শহিদুল্লাহ কায়সার, আমি, আমরা এরকম কিছু পেশাদার রাজনীতিক হিসেবে সংবাদপত্রে এসেছিলাম।
১৯৫৯ সালের কথা। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের এক বছর কাটতে চলল। ডাকসুর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে ঢাকা হল অর্থাৎ শহিদুল্লাহ হল থেকে আমাকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে আমাকে কলা ভবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। তখন বন্ধু আহমেদুর রহমান ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ভীমরুল ছদ্মনামে কলাম লিখতেন। ইত্তেফাকের অন্যতম সহকারী সম্পাদক ছিলেন এমএ আউয়াল। তিনি দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আমি ছিলাম দফতর সম্পাদক। একদিন আহমেদুর রহমান এসে বললেন, আপনাকে ইত্তেফাকে জয়েন করতে হবে। আউয়াল সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। মি বলেছিলাম, আমি রাজনীতি করি। কারো অধীনে চাকরি করব না। টিউশনি করেই বেঁচে থাকব। বন্ধুরা বললেন, এভাবে বেঁচে থাকা যাবে না। গ্রেফতার হলে সাংবাদিক হিসেবেই মুক্তি দাবি করা যাবে। বন্ধুদের কথায় ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বরে ইত্তেফাকে যোগ দিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। অক্টোবরে শেষ সপ্তাহে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়ে গেলাম। ১৯৬২ সালে জেলখানা থেকে এসে যোগ দিয়েছিলাম দৈনিক জেহাদে। তখন থেকে রাজনীতির সঙ্গে আমার অন্যতম পেশা হচ্ছে সাংবাদিকতা। আমার মতোই অধিকাংশ সাংবাদিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আমাদের দেশের সাংবাদিকদের একটি রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান ছিল সর্বকালের। ফলে কোনো জাতীয় সমস্যা দেখা দিলে সাংবাদিক এবং একই সঙ্গে রাজনীতিকের ভূমিকা পালন করতে হতো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার স্বাক্ষর আছে।
