প্রকৃতপক্ষে কোনোদিনই এ গোপন বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আমার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাদের ভালোবাসার বা বিরোধিতার প্রশ্নও কোনোদিন দেখা দেয়নি। তারাই আমাদের নামে তাদের কাগজপত্র প্রেস ক্লাবে পাঠিয়ে দিত। প্রেসক্লাবে এ কাগজপত্রের প্রাপক ছিলাম আমি ও এনায়েতুল্লাহ খান। সেকালে সাম্যবাদী দলের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা আত্মগোপন করেছিলেন। তার সন্ধান আমার জানা ছিল। কোনো বাইরের লোক তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে সে ব্যবস্থাও কম করিনি। বাংলাদেশের রাজনীতির সুবিধা বা ক্ষতিকর দিক হচ্ছে সেকালের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান থেকে শুরু করে আত্মগোপনকারী বাম নেতা মোহাম্মদ তোয়াহাসহ অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। পর্বতপ্রমাণ রাজনৈতিক মতান্তরের মধ্যেও এ ধরনের সম্পর্ক অটুট ছিল। তাই এদের সকলের সঙ্গে আমাদের একটা সহজ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বিরাজ করত। আমি আজও বুঝতে অক্ষম সেকালে সর্বহারা পার্টি আমাকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিল। পরবর্তীকালে মনে হয় পশ্চিমবঙ্গের নকশাল নেতা চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হয়েছে। চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর দৈনিক বাংলায় আমি একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম। আমার সেই লেখা নিয়ে বিতর্ক হয়। লেখা ছাপা হয় সাপ্তাহিক হলিডেতে। ওই সময় আর একটি চিঠি আসে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। সে চিঠিও সাপ্তাহিক হলিডেতে প্রকাশিত হয়। সে চিঠিতে দাবি করা হয় যে নির্মল সেনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সঠিক।
এর কিছুদিন পর আমি বরিশাল যাই। বরিশালে এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। ওই বাসায় সর্বহারা পার্টির দুটি ছেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমাকে বলা হলো–রাত বারটায় কোনো একটি জায়গায় তাদের সঙ্গে আমাকে যেতে হবে। তারা চারু মজুমদার সম্পর্কে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। আমি রাজি হলাম। তবে আমার শর্ত ছিল আমার সঙ্গে বৈঠককালে সিরাজ সিকদারকে হাজির থাকতে হবে। যদি সিরাজ সিকদার সম্মত হয় তা হলে রাত বারটায় আমি তাদের সঙ্গে যাব। তারা আমার সঙ্গে কথা বলে চলে যায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
এমনি করে অসংখ্য ঘটনার মধ্যদিয়ে ১৯৭৩ সাল কেটে যায়। ১৯৭৪ সালে নতুন করে আমন্ত্রণ আসে পূর্ব জার্মান অর্থাৎ জিডিআর-এর পক্ষ থেকে। দীর্ঘদিন থেকে পূর্ব জার্মান সাংবাদিক সমিতির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ১৯৭২ সালে জিডিআর সফরকালে একই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আমি সম্মত হইনি। আমি তখন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। কোনো জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন তখনো গঠিত হয়নি। এছাড়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যতীত দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালে কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তি করা সঠিক হবে কিনা তাও আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। ১৯৭২ সালে সে চুক্তি আমি স্বাক্ষর করিনি। এতে আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরা অখুশি হয়েছিল। জিডিআর-এর সাংবাদিক ইউনিয়নও আদৌ আমার প্রতি খুশি ছিল না।
কিন্তু আমি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি। এবার আবার নতুন করে জিডিআর সাংবাদিক ইউনিয়ন আমাদের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। আমরা তাদের সঙ্গে চুক্তি খসড়া নিয়ে আলোচনা করি। উভয় সরকারকে অবহিত করি এবং এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্যে আমি ও তৎকালীন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কামাল লোহানী জিডিআর যাই।
জিডিআর যাত্রার আগের দিন সন্ধ্যায় আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যাই। ঢুকেই আমি প্রধানমন্ত্রীর তল্কালীন সচিব এককালের পুলিশ প্রধান আব্দুর রহিমকে লেখার কাগজ নিয়ে আসার অনুরোধ জানাই। তাকে বলি, আমার সেই মামলাটা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি লিখে দিন। কারণ ওই মামলা চলতে পারে না।
প্রকৃতপক্ষে ঘটনা ছিল ভিন্নরকম। আমার বন্ধু কোলকাতায় ছ’মাস থেকে চলে এসেছে। কিন্তু মামলা নিয়ে আদৌ এগোনো যাচ্ছিল না। পুলিশ কর্তৃপক্ষ বারবার বাধা দিচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী কোনো কিছু করতে পারছিলেন না। আমার বন্ধুকে বাঁচানো কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। এ সময় জানা গেল, পুলিশের সকল কর্মকাণ্ডই একটি ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করে রচনা করা হয়েছে। যে বাড়িতে অস্ত্র পাওয়া গেছে সে বাড়ির মালিক আমার বন্ধুর এক পড়শি। অথচ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে মামলায় জড়ানো হয়েছে আমার বন্ধু এবং তার পরিবারকে। আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল–বিদেশ যাওয়ার আগে এর একটি ফয়সালা করে না গেলে আমার বন্ধুর বিপদ হবে। আমার অনুপস্থিতিতে দুঃখজনক কিছু ঘটে যেতে পারে।
আমিও তাই প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকেই মামলা প্রত্যাহারের কথা বললাম। রহিম সাহেবকে কাগজ আনতে বলে প্রধানমন্ত্রীকে সব ঘটনা জানালাম। তিনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, আপনি বিদেশ চলে যান। আমি দেখছি কী করা যায়। আমাদের সঙ্গে সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী গিয়াস কামালকে বললেন–তুই এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখবি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর কথা রেখেছিলেন। দেশে ফিরে এ মামলা নিয়ে আমাকে তেমন আর ঝামেলা পোহাতে হয়নি। শুধুমাত্র এসব দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া দরখাস্তটি ফিরিয়ে আনা হয়নি।
