এ সম্মেলনে রওনা হওয়ার আগে ঢাকায় একটি ঘটনা ঘটে। হঠাৎ শুনতে পেলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের এই সম্মেলনে যেতে বারণ করেছেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে–দেশে নির্বাচন আসন্ন। সুতরাং আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের অর্থ হচ্ছে–কে জি মুস্তফা ও আমি। তখন আবার প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশ যেতে হলে সরকারি অনুমতি লাগত। আমরা ঠিক করলাম প্রধানমন্ত্রীকে কোনো কিছু জানাব না। আমরা বিমান বন্দরে চলে যাব। কোনো পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি এলে তখন ভেবে দেখা যাবে। আমরা নির্বিঘ্নেই চলে গেলাম।
দিল্লি বিমানবন্দরে আর একটি ঘটনা ঘটল। তখন নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার অর্থাৎ বিএসএস-এর প্রতিনিধি ছিলেন আতাউস সামাদ। বিমানবন্দরে তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, দাদা, আপনিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সম্মেলনে এলেন? এ সম্মেলন নিয়ে সেকালে আমি দীর্ঘদিন লিখেছিলাম অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায়। সে ঘটনার আমি পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। তবে দুই একটি ঘটনা এখনো আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
সে সম্মেলনে গিয়েছিলাম আর একটি ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে। সে সম্মেলনে এসেছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ গুনার মৃডাল দম্পত্তি। তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল আমার প্রবল। তাঁর সঙ্গে দেখাও হয়েছিল। তার কথাগুলো আজো আমার কানে বাজছে। তুমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছ যাদের নিচে নামবার এখন আর জায়গা নেই। বাঁচতে হলে উপরের দিকে উঠতে হবে। নামবে কোথায়? তোমরা তো শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের সম্পর্কে আর বেশি কিছু তিনি বললেন না। অনেকদিন আগের কথা। এখন স্মৃতিচারণের অঙ্গ। আজ লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে-এশিয়ান ড্রামার লেখক শুনার মৃডাল সঠিক কথা বলেননি। আমাদের নামবার জায়গা ছিল। এখনো মামছি। এ নামার শেষ দেখা না গেলে আর উপরে ওঠা যাবে না।
অখণ্ড এশিয়া সম্মেলনের শেষ দৃশ্যটি ছিল আরো উল্লেখ্যযোগ্য। সংবাদ সম্মেলন হচ্ছিল। সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নে জবাব দিচ্ছিলেন তকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। সংবাদ সম্মেলন উপস্থাপনা করেছিলেন জাতিসংঘের ভারতের খ্যাতিমান প্রতিনিধি নেনেগাল রনসীমা রাও। এই সম্মেলনে শেষ প্রশ্ন করেছিলাম আমি। আমি লিখিত প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অংশগ্রহণ ব্যতীত এ ধরনের অখণ্ড এশিয়া সম্মেলন আদৌ কোনো সাফল্য বয়ে আনবে কি? চীনের সঙ্গে তখন ভারতের শীতল সম্পর্ক চলছিল। আর চীন বাংলাদেশকে তখনও স্বীকৃতি দেয়নি। তাই আমার প্রশ্নটি উত্থাপনের পর হেসে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। তিনি বললেন, এ প্রশ্নটি আমাদের থেকে করা হয়েছে? তিনি বললেন, চীন যদি এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে আমাদের বলার কিছু নেই। আমার জানা মতে, সে সম্মেলনে চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনের পর শুরু হলো চা-পর্ব। চা-পর্বে দেখা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সাংবাদিকদের সাথে। বৃহত্তর এশিয়ার অংশ বলে ওই সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রতিনিধি এসেছিল। তারা আমাকে বললেন, তুমি তো সেই নির্মল সেন। তুমি মস্কো গিয়েছিলে এবং তুমি এ ধরনের আলোচনা করেছিলে মস্কোতে। তোমার নাম পরিবর্তন হয়নি।
নয়াদিল্লি থেকে ফেরার পথে আসানসোলে গিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল তখন আমার মা থাকতেন। মায়ের সাথে দেখা করে ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেল।
তখন ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় চলছিল। ঢাকায় ফিরে আর একটি খবর পেলাম। খবরটি খুব ভয়ের না হলেও নিঃশঙ্ক হওয়ার মতো নয়। খবরটি দিলেন এক সংবাদিক বন্ধু। এককালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টি। তিনি চীনের অনুসারী ছিলেন। বর্তমানে বিএনপি করেন। তিনি বললেন, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। সর্বহারা পার্টির পক্ষ থেকে আপনাকে খুন করার চেষ্টা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সফল হয়নি। যারা আপনাকে খুন করতে গিয়েছিল তাদের মধ্যে নোয়াখালীর একটি ছেলে ছিল। সে ইত্তেফাকের সাংবাদিক বজলুর রহমান অর্থাৎ বজলু ভাইয়ের বাড়িতে গৃহশিক্ষক ছিল। সে সর্বহারা পার্টির সদস্য। একদিন তাদের একটি দল নাকি আমার নতুন পল্টনের বাসায় যায়। তাদের দলীয় নেতা আমার বাসায় যাওয়ার পর সকলকে জানানো হয়, সেদিনের অভিযুক্ত ছিলাম আমি। আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এই গৃহশিক্ষক নাকি সকলের সঙ্গে একমত হতে পারেনি। সে বলেছিল, বর্তমান সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ওই একজন লোকই লিখছে এবং বলছে। সুতরাং তাকে হত্যা করা হবে কেন? তার এই কথায় সেদিনের অভিযান অসমাপ্ত থেকে যায়। শুনেছি ওদের নিয়ম হচ্ছে সকলে একমত না হতে পারলে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয় না। পরবর্তীকালে ওই গৃহশিক্ষক সর্বহারা দল ছেড়ে দেয়। রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার পরেই সে আমার পরিচিত সাংবাদিককে এ কথা জানায়। তার বার্তা ছিল, নির্মল সেনকে সাবধান থাকতে বলবেন। আমার জন্যে তিনি এবার বেঁচেছেন। পরের বার হয়তো তিনি বাঁচবেন না।
আমি এ ব্যাপার নিয়ে তখন খুব একটা হইচই করিনি। আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুরাও এ কথা জানতে পারেনি। আর আজ পর্যন্ত আমি এ ঘটনারও কিনারা করতে পারিনি।
